প্রকাশ ২৬ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
সম্প্রতি কুমিল্লায় ঘটে যাওয়া মা-মেয়ের হত্যাকাণ্ড কেবল একটি ব্যক্তি বা পরিবারকে নয়, পুরো সমাজকে সজাগ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে গেছে। এটি ধর্মের নামে ভণ্ডামি, অজ্ঞতা ও ইসলামী শিক্ষার প্রতি অবহেলার এক করুণ চিত্র। এক শিক্ষিত মা ও তার বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া কন্যা কবিরাজের নামে এক প্রতারকের হাতে আত্মসমর্পণ করেছিলেন জিনের প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ভণ্ডই হয়ে ওঠেন তাদের মৃত্যুদূত।
বাংলাদেশে ভণ্ড ডাক্তার বা প্রতারক কবিরাজের ঘটনা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে প্রতারণা করা, তাদের ভীত করে অর্থ ও নিয়ন্ত্রণ অর্জন করার চক্র বিদ্যমান। সম্প্রতি রুকইয়ার নামে ভণ্ড চিকিৎসা আরও নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রকৃত রুকইয়া হলো কোরআন-হাদিসের আলোকে ঝাড়ফুঁক বা দোয়ার মাধ্যমে চিকিৎসা করা, যেখানে কোনো ধরনের শিরক, কুসংস্কার, নারীর সঙ্গে অনৈতিক মেলামেশা বা শ্লীলতাহানি নেই। যে ব্যক্তি এটি বাস্তবায়ন করেন, তাকে আরবিতে রাকি বলা হয়। কিন্তু আজকের সমাজে কিছু সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি রুকইয়ার পদ্ধতিকে বাণিজ্যিক রূপ দিয়েছেন, কালো জাদু ও নারীর শোষণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন। কুমিল্লার মা-মেয়ের হত্যা এই অপব্যবহারের ভয়াবহ ফলাফল।
ইসলামে নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তার জন্য পর্দা এক অপরিহার্য বিধান। কোরআন স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে নারীদের নিজেদের চাদর দ্বারা শরীর ঢাকতে এবং সৌন্দর্য প্রকাশ সীমিত রাখতে, যাতে তারা উত্ত্যক্ত বা অবমাননার শিকার না হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে পর্যন্ত নারীদের সাথে শারীরিক সংস্পর্শ না রাখার মাধ্যমে সীমারেখা নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং, আজ যারা রুকইয়ার নামের প্রতারণায় নারীর শরীরে হাত দেন বা নির্জনে সাক্ষাৎ করে, তারা স্পষ্টভাবে হারাম কাজে লিপ্ত। সমাজ ও পরিবারকে অবশ্যই তাদের থেকে দূরে থাকার জন্য সচেতন থাকতে হবে।
ধর্মের নামে প্রতারণা রোধে সঠিক ইসলামী জ্ঞানের গুরুত্ব অপরিসীম। কোরআনের প্রথম বাণীই হলো “পড়ো”, যা মানবজীবনে জ্ঞান অর্জনের অপরিহার্যতা নির্দেশ করে। সহিহ ইসলামী জ্ঞান কেবল বিশ্বস্ত আলেম ও প্রামাণ্য সূত্র থেকে গ্রহণ করা উচিত। মিথ্যা কবিরাজ, অশিক্ষিত পীর বা অযোগ্য রাকিদের কাছে ধর্ম ও চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যাখ্যা গ্রহণ করা কখনোই নিরাপদ নয়।
রুকইয়ার নিরাপদ ও কার্যকর পদ্ধতি হলো সেলফ রুকইয়া বা নিজেই নিজের জন্য রুকইয়া করা। প্রয়োজনে পরিবারের নিকটজনকেও অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘুমের আগে নিজের হাতের তালুতে সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে নিজের শরীরে মাসাহ করতেন। অসুস্থ অবস্থায় আয়েশা (রা.)-কে একই কাজ করার নির্দেশ দিতেন। পাশাপাশি সকাল-সন্ধ্যা দোয়া, মঞ্জিলের ৩৩ আয়াত, সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি এবং চার কুল পাঠের মাধ্যমে আত্মরক্ষা করা যেতে পারে।
আজকের সমাজে, রুকইয়ার নামে ভণ্ডদের বাণিজ্য ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। কবিরাজ, পীর এবং অযোগ্য রাকি নামধারীরা মানুষের দুর্বলতা ও ধর্মীয় অজ্ঞতাকে পুঁজি করে প্রতারণা, শারীরিক ও আধ্যাত্মিক শোষণ চালাচ্ছেন। কুমিল্লার মা-মেয়ের ঘটনাটি এই অপরাধের ভয়াবহ বাস্তব চিত্র। যদি তারা সহজ, নিরাপদ ও সুন্নতি রুকইয়া বা যোগ্য আলেমদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন, হয়তো এই করুণ মৃত্যু ঘটত না।
ইসলামী শিক্ষার আলোতে নারীর নিরাপত্তা, ধর্মীয় সচেতনতা এবং ভণ্ডামি প্রতিরোধের জন্য পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারগুলোকে নারীদের শিক্ষিত ও সচেতন করার পাশাপাশি ভণ্ডদের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইসলামিক মূল্যবোধে সচেতনতা বৃদ্ধির দায়িত্ব নিতে হবে। সরকারকে কঠোর আইন প্রয়োগ করে প্রতারণাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সমাজে নারীর নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষার জন্য ইসলামের শিক্ষার যথাযথ প্রয়োগ ছাড়া বিকল্প নেই। কুমিল্লার মা-মেয়ের হত্যাকাণ্ড আমাদের কাছে একটি করুণ সতর্কবার্তা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এটি দেখিয়েছে, ভণ্ড কবিরাজ ও ধর্মের নামে প্রতারণাকারীরা মানুষের জীবন পর্যন্ত কেড়ে নিতে পারে। ইসলামের সহিহ জ্ঞান, নিরাপদ রুকইয়া এবং সচেতন সমাজ গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা এই অন্ধকার থেকে মুক্তি পেতে পারি। এখন সময় এসেছে—সমাজকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি কুসংস্কারের শিকার হতে দেব, নাকি ইসলামের শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধের আলোয় নারীর নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করব।