প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশে জন্মগত হৃদরোগ একটি নীরব মহামারি হিসেবে বিস্তার লাভ করছে। প্রতিদিন প্রায় ২০০ শিশু এই জটিল রোগ নিয়ে জন্ম নিচ্ছে, বছরে যার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৭৩ হাজারে। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক শিশুর মধ্যে অধিকাংশই চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছে। মূলত ব্যয়বহুল চিকিৎসা, স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উপর ভিত্তি করেই এ সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। গবেষণা বলছে, জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুদের ৯৫ শতাংশই গ্রামে জন্মায়, অথচ চিকিৎসার শতভাগ সুযোগ-সুবিধা রয়েছে শহরে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায়। ফলে রোগীরা চিকিৎসার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং অনেক শিশুর জীবন অকালে ঝরে যাচ্ছে।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বাসিন্দা আশরাফুল ইসলামের তিন বছরের কন্যা তাশরিফার ঘটনা এ বাস্তবতার প্রতিফলন। জন্মের পাঁচ মাসের মাথায় জানা যায় তার হৃদপিণ্ডে ছিদ্র রয়েছে। স্থানীয় মেডিকেলে চিকিৎসা নিতে গিয়ে অব্যবস্থাপনার শিকার হয়ে ফিরে আসতে হয় পরিবারটিকে। আর রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ বহন করার সামর্থ্য না থাকায় তাশরিফা আজও চিকিৎসাহীন। এটি নিছক একটি ঘটনা নয়, বরং এমন অসংখ্য শিশুর গল্প প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো প্রান্তে ঘটে চলেছে।
স্বাধীনতার ৫৪ বছরে শিশু কার্ডিয়াক চিকিৎসায় কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। জন্মগত হৃদরোগ এখনো জাতীয় শিশুরোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এর ফলে অনেক শিশু চিকিৎসার আওতায় আসে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জন্মগত হৃদরোগকে গুরুত্ব না দিলে আগামী প্রজন্মের জন্য ভয়াবহ সংকট তৈরি হবে। শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নূরুন্নাহার ফাতেমা বলেন, জন্মগত হৃদরোগ দিন দিন মহামারির আকার ধারণ করছে। এটি ডেঙ্গু বা কোভিডের মতোই বড় হুমকি হয়ে উঠলেও এখনো এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।
গবেষণা বলছে, প্রতি তিনজন জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুর মধ্যে একজন সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় জন্মের এক বছরের মধ্যেই মারা যায়। চিকিৎসা পাওয়া শিশুদের মধ্যেও অনেকেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারে না। বর্তমানে আক্রান্তদের মাত্র ১০ শতাংশ পূর্ণ চিকিৎসার আওতায় আসছে।
এ সংকটকে আরও জটিল করেছে কার্ডিয়াক সেন্টারের অপ্রতুলতা। রাজধানী ঢাকা ছাড়া অন্য পাঁচ বিভাগ—রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে সীমিত আকারে সরকারি-বেসরকারি কার্ডিয়াক সেন্টার রয়েছে। কিন্তু বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে এখনো কোনো কার্ডিয়াক সেন্টারই নেই। ফলে এসব অঞ্চলের শিশুদের জন্য রাজধানীই একমাত্র ভরসা।
বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের শিশু হৃদরোগ সার্জন ডা. এম এ কে আজাদ বলেন, শিশুর জটিল হৃদরোগ চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন বিশেষ কাঠামো, যা এখনো গড়ে ওঠেনি। প্রাপ্তবয়স্ক হৃদরোগের অবকাঠামো দিয়ে শিশুদের চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে হওয়ায় বিশেষ স্বাস্থ্যবীমা চালু করা জরুরি বলে তিনি মত দেন। তার মতে, আসল সংকট হলো রোগীর প্রকৃত সংখ্যা জানা যাচ্ছে না এবং যাদের শনাক্ত করা যাচ্ছে তাদেরও সুচিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
গতকাল রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, শিশু হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানো এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা জরুরি। কিডস হার্ট ফাউন্ডেশনের সভাপতি ডা. নূরুন্নাহার ফাতেমা বলেন, নবজাতকদের প্রাথমিক পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে জন্মগত হৃদরোগ দ্রুত শনাক্ত করা যায় এবং জটিলতা দেখা দেওয়ার আগে চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়।
দেশবরেণ্য হৃদরোগ সার্জন অধ্যাপক ডা. এসআর খান বলেন, শিশু হৃদরোগের পেছনে কিছু প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিবাহ, চিকিৎসাহীন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, গর্ভাবস্থায় কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি এবং ভাইরাসজনিত রোগ। তিনি মনে করেন, সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে অনেক শিশুকে এ রোগ থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
বাংলাদেশে জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুদের বাস্তবতা এক ভয়াবহ সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এ বিষয়ে গুরুত্ব না দিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। কার্ডিয়াক সেন্টার বাড়ানো, গ্রামীণ পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, স্বাস্থ্যবীমা চালু করা এবং বিশেষজ্ঞ তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ ছাড়া এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
আজ বিশ্ব হৃদরোগ দিবসের প্রতিপাদ্য “ডোন’t মিস এ বিট” বা “প্রতিটি হৃদস্পন্দনই জীবন”। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ প্রতিপাদ্য কেবল একটি বার্তাই নয়, বরং একটি সতর্ক সংকেত। জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত প্রতিটি শিশুর হৃদস্পন্দন যেন থেমে না যায়, সে জন্য এখনই রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।