প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ফেনীতে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়রা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সোমবার জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ফেনীতে নতুন করে ১৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে ফেনী সদর উপজেলার ১০ জন, দাগনভূঞা উপজেলার ৩ জন, সোনাগাজী উপজেলার ২ জন এবং ছাগলনাইয়া উপজেলার ৩ জন বর্তমানে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
ফেনী সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ রুবাইয়াত বিন করিম জানান, চলতি বছর ফেনীতে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেপ্টেম্বর মাসে ইতোমধ্যে জেলায় মোট ৮৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। আগের মাস আগস্টে এই সংখ্যা ছিল ৪৯ জন। এভাবে চলতি বছর জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১৬৯ জনে পৌঁছেছে। আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
জেলার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ডেঙ্গুর পরীক্ষার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ কিট মজুত আছে। সিভিল সার্জনের কথায়, বর্তমানে ৩ হাজার ৬৫৯টি ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট জেলায় উপলব্ধ রয়েছে। তবে এভাবে রোগের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা ও চিকিৎসক সেবার চাপও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ফেনী জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ স্থানীয় জনগণকে সতর্ক করে জানিয়েছে, ডেঙ্গু ছড়ানোর মূল কারণ হলো মশার লার্ভা। তারা নদী, খাল, পুকুর, ঘরের আশেপাশের ফাঁকা পাত্র বা জলবাহী স্থানগুলোর পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করতে এবং পানির স্তর জমে থাকা প্রতিরোধে তৎপর থাকার জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন। এছাড়া, আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে বেশিরভাগই শহরের কেন্দ্রীয় এলাকা ও গ্রামীণ এলাকায় মশার প্রভাবে সংক্রমিত হয়েছেন। বিশেষ করে ফেনী সদর, দাগনভূঞা এবং ছাগলনাইয়া অঞ্চলের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই এলাকা ডেঙ্গু রোগে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বর্ষা ও পারিপার্শ্বিক পানির কারণে মশার বৃদ্ধি বেড়েছে এবং এই কারণে রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে।
ফেনীর জেলা প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য বিভাগ ইতিমধ্যে বিভিন্ন সচেতনতা কার্যক্রম শুরু করেছে। স্কুল, কলেজ এবং সম্প্রদায়িক কেন্দ্রগুলিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধ বিষয়ক সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ, মোবাইল ভ্যানের মাধ্যমে জনগণকে রোগ প্রতিরোধমূলক সতর্কতা জানানো এবং স্থানীয়ভাবে মশার লার্ভা ধ্বংসে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
ডা. রুবাইয়াত জানান, “ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রতিটি পরিবারকে তাদের আশেপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। পানি জমে থাকা কোনো পাত্র যেন না থাকে এবং বাচ্চাদের খোলা জায়গায় মশার কামড় থেকে রক্ষা করতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এই মুহূর্তে আমাদের লক্ষ্য হলো সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা এবং রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা।”
স্থানীয় জনগণও ইতিমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সাতকোনা, চরফ্যাশন, দাগনভূঞা ও সোনাগাজী এলাকার মানুষদের মধ্যে দেখা গেছে, তারা এখন স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফেরার জন্য উদ্বিগ্ন। তারা প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। স্থানীয়রা বলেন, “ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হওয়া মানেই চিকিৎসার জন্য সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে জটিলতা বাড়তে পারে। আমরা চাই দ্রুত হাসপাতাল, ডাক্তারের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হোক এবং রোগ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।”
ফেনী জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, চলতি বছর জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ আগের বছরের তুলনায় তুলনামূলকভাবে বেশি। তাদের মতে, শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলে পানি জমে থাকা স্থানগুলোর দ্রুত পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের তদারকি একমাত্র উপায় যাতে রোগের বিস্তার কমানো যায়।
ডেঙ্গুর পাশাপাশি, স্বাস্থ্যকর্তৃপক্ষ জানান যে, রোগের প্রাদুর্ভাব এড়াতে সাধারণ মানুষকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিধি মেনে চলার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। যেমন, শারীরিকভাবে মশার কামড় থেকে রক্ষা পেতে লম্বা হাতা ও পা ঢাকা পোশাক পরা, রাতে বিছানায় মশারি ব্যবহার করা এবং পুংখানুপুঙ্খভাবে পরিবেশ পরিষ্কার রাখা।
ফেনীতে এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় কমিউনিটি নেতারা একসঙ্গে কাজ করছে। তারা আশা প্রকাশ করেছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। তবে স্থানীয় জনগণ এবং প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি না হলে, রোগের বিস্তার কমানো কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ায় ফেনীতে স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা প্রকট হয়ে উঠেছে। স্থানীয় হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, ডেঙ্গু পরীক্ষা কিটের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
ফেনী জেলা প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য বিভাগ আশা করছে, জনগণ নিজেও সচেতন হবে এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে তাদের দায়িত্ব পালন করবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ফেনীর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও সুসংহত করবে এবং ডেঙ্গুর মতো রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে।
সিভিল সার্জন ডা. রুবাইয়াত বিন করিম বলেন, “আমরা প্রতিদিন নতুন আক্রান্তদের তথ্য সংগ্রহ করছি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে দ্রুত সঠিক চিকিৎসা প্রদান করা এবং ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো। জনগণের সচেতনতা এবং প্রশাসনের তৎপরতা মিলিতভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখবে।”
ফেনীতে চলতি বছরের এই পরিস্থিতি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রোগ প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং জনগণের যৌথ উদ্যোগ ছাড়া সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাই এখনই সময় জনগণকে সতর্ক এবং দায়িত্বশীল হতে হবে।