আন্তর্জাতিক হিফজ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি আনাসের বিশ্বজয়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ২১ বার

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশ আবারও বিশ্ব দরবারে কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে গৌরব অর্জন করেছে। লিবিয়ায় অনুষ্ঠিত মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তরুণ হাফেজ আনাছ তৃতীয় স্থান অর্জন করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। রবিবার রাতে লিবিয়ার আওকাফ ও ইসলাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। এ প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ৭৫টি দেশের ১২০ জন প্রতিযোগী অংশ নেন, যা আয়োজনকে শুধু ইসলামি বিশ্বেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও ব্যাপক গুরুত্ববহ করে তোলে।

হাফেজ আনাছের এ অর্জন কোনো ব্যক্তিগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি পুরো বাংলাদেশের জন্য এক গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার লুপাড়া গ্রামের সন্তান এবং হাফেজ মাওলানা আতিকুর রহমানের ছেলে। বর্তমানে তিনি পড়াশোনা করছেন মারকাজুত তাহফিজ ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসায়। তার মেধা, নিষ্ঠা এবং কোরআন অধ্যয়নে একাগ্রতা তাকে বিশ্ব প্রতিযোগিতায় এই সাফল্যের শীর্ষে নিয়ে গেছে।

প্রতিযোগিতায় লিবিয়ার প্রতিযোগী প্রথম স্থান অর্জন করেন, দ্বিতীয় হন ঘেনিয়ার প্রতিযোগী, তৃতীয় স্থান অর্জন করেন বাংলাদেশি আনাছ, চতুর্থ স্থান অর্জন করেন ইয়েমেনের প্রতিনিধি এবং পঞ্চম হয়েছেন জার্মানির হাফেজ। এমন একটি প্রতিযোগিতায়, যেখানে প্রতিটি অংশগ্রহণকারী দীর্ঘদিন ধরে কোরআন তেলাওয়াত ও হিফজের অনুশীলনে পারদর্শী, সেখানে বাংলাদেশের একজন তরুণের এই সাফল্য নিঃসন্দেহে দেশের জন্য একটি বিরল সম্মান।

মারকাজুত তাহফিজ ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা নেছার আহমদ আন-নাছিরী তার ছাত্রের এ অর্জন প্রসঙ্গে গভীর আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, “আমি আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিনের শোকর আদায় করছি। এটা শুধু হাফেজ আনাছের সাফল্য নয়, বরং বাংলাদেশের মর্যাদার প্রতীক। সে প্রমাণ করেছে, এ দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরতে সক্ষম।”

উল্লেখ্য, লিবিয়ার এই প্রতিযোগিতা দীর্ঘ ১১ বছর বন্ধ থাকার পর পুনরায় শুরু হয়েছে। এই প্রতিযোগিতা শুধু কোরআন তেলাওয়াতের সৌন্দর্য প্রদর্শনের প্ল্যাটফর্মই নয়, বরং বিভিন্ন দেশের তরুণ হাফেজদের জন্য পারস্পরিক বিনিময় ও ইসলামের সৌন্দর্য প্রচারের ক্ষেত্র হিসেবেও কাজ করে। বাংলাদেশ পূর্বেও এই প্রতিযোগিতায় বিভিন্নবার উজ্জ্বল সাফল্য অর্জন করেছে।

২০২২ সালে সালেহ আহমদ তাকরীম এই প্রতিযোগিতায় সপ্তম স্থান অধিকার করে আলোচনায় আসেন। তার এক বছর পর, ২০২৩ সালে আবু তালহা দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে বাংলাদেশকে সম্মানিত করেন এবং পুরস্কার হিসেবে পান ২ লাখ দিনার। একই বছরে মুস্তাফিজুর রহমান গাজী তাফসির বিভাগে ষষ্ঠ স্থান পান। ২০২৪ সালে মাহমুদুল হাসান তাফসির বিভাগে সাফল্য অর্জন করে দেশের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি করেন। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, বাংলাদেশের তরুণ হাফেজ ও তেলাওয়াতকারীরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নিজেদের প্রতিভা দিয়ে আলোকিত করছেন।

বাংলাদেশের ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক দিন ধরেই বিশ্বমানের হাফেজ তৈরি করছে। দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহর, সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা কওমি ও হিফজ মাদরাসাগুলো এই ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। আনাছের মতো মেধাবী হাফেজদের সাফল্য প্রমাণ করে, সঠিক প্রশিক্ষণ, অধ্যবসায় এবং ঈমানি চেতনা থাকলে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাও আন্তর্জাতিক মানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম।

হাফেজ আনাছের পরিবার ও স্বজনরাও এ অর্জনে গর্বিত। তার বাবা হাফেজ মাওলানা আতিকুর রহমান ছেলের সাফল্যে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “আমার সন্তান শুধু আমার নয়, পুরো দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে। আমি দোয়া করি, সে যেন কোরআনের সেবায় আজীবন নিয়োজিত থাকে।” স্থানীয় গ্রামবাসীরাও এ সাফল্যকে নিজেদের অর্জন হিসেবে দেখছেন। অনেকেই বলেন, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কোরআন শিক্ষা গ্রহণে অনুপ্রাণিত করবে।

বিশ্ব প্রতিযোগিতায় এমন সাফল্য শুধু একটি ব্যক্তির নয়, বরং পুরো জাতির মর্যাদাকে বিশ্ব দরবারে উজ্জ্বল করে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের নাম বারবার উচ্চারিত হওয়া প্রমাণ করে, দেশের তরুণ প্রজন্ম কেবল আধুনিক শিক্ষা বা প্রযুক্তি ক্ষেত্রে নয়, ইসলামি জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে। এটি দেশের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

বাংলাদেশে কোরআন শিক্ষা ও হিফজ প্রতিযোগিতার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। স্থানীয় মসজিদ, মাদরাসা ও ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে হাজারো শিশু কোরআন হিফজ করছে, যা জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে আরও উৎসাহিত করা হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই সাফল্য সেই প্রক্রিয়ারই ধারাবাহিকতা।

অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, সরকার যদি মেধাবী হাফেজদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য পেশাদার প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে, তবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা আরও বড় বড় সাফল্য নিয়ে আসতে পারবে। একই সঙ্গে, দেশের ব্র্যান্ড ইমেজ বিশ্বব্যাপী আরও উজ্জ্বল হবে।

সবশেষে বলা যায়, হাফেজ আনাছের এই সাফল্য বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চর্চার শক্তিশালী অবস্থানকে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরেছে। লিবিয়ার মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম শুধু নিজেদের স্বপ্ন পূরণেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো জাতির স্বপ্ন বহন করে বিশ্বমঞ্চে আলোকিত হতে পারে। এই অর্জন দেশের ইতিহাসে একটি অনন্য অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত