ডিপ্রেশনের আধ্যাত্মিক আরোগ্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ১৭ বার

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

আধুনিক বিশ্বে ডিপ্রেশন এখন একটি নীরব মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। শহুরে জীবনযাত্রার চাপ, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন, পারিবারিক ও সামাজিক টানাপোড়েনের কারণে দিন দিন বাড়ছে মানসিক অবসাদে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে পৃথিবীর অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে অন্যতম হলো মানসিক অবসাদ বা ডিপ্রেশন। বাংলাদেশও এই বাস্তবতা থেকে বাদ যায়নি। তবে মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা কেবল আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক চিকিৎসার পথও রয়েছে। বিশেষ করে ইসলাম ধর্মে ডিপ্রেশন মোকাবেলায় যে সব দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা মানসিক প্রশান্তি লাভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ইসলাম একদিকে যেমন দেহের চিকিৎসাকে জরুরি মনে করে, অন্যদিকে আত্মার সুস্থতাকেও সমান গুরুত্ব দেয়। তাই মুসলমানদের জন্য ডিপ্রেশন থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে হলে ইসলামী শিক্ষা ও অনুশীলনগুলো বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আল্লাহর প্রতি দৃঢ় ঈমান, ইবাদতে স্থিরতা, ধৈর্য, আত্মতুষ্টি, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় ইসলামী নির্দেশনা অবসাদ দূরীকরণে কার্যকর হতে পারে।

প্রথমত, বিশুদ্ধ ঈমানকে ডিপ্রেশন প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইসলামে বলা হয়েছে, মানুষের অন্তরের প্রশান্তি ও স্থিরতা সরাসরি ঈমানের সঙ্গে সম্পর্কিত। ঈমান যত দৃঢ় হয়, জীবনের কষ্ট ও বিপদ তত সহজে সহ্য করা যায়। তাই আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা, তাঁর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং প্রতিটি পরিস্থিতিতে তাঁর রহমতের আশায় থাকা একজন মুসলমানকে মানসিক অশান্তি থেকে রক্ষা করে।

দ্বিতীয়ত, ইবাদত বা উপাসনার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা ডিপ্রেশন কমানোর অন্যতম পথ। সালাত, দোয়া ও জিকির শুধু ধর্মীয় কর্তব্যই নয়, এগুলো মানুষের অন্তরে প্রশান্তি আনে। গবেষণাতেও প্রমাণিত হয়েছে, নিয়মিত প্রার্থনা ও ধ্যান মানসিক চাপ কমাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। আল্লাহর স্মরণে মানুষের হৃদয়ে প্রশান্তি নেমে আসে, যা ডিপ্রেশনের অন্ধকার ভেদ করার শক্তি জোগায়।

তৃতীয়ত, জীবনে আসা বিপদ-আপদ বা মুসিবতে ধৈর্য ধারণ করা মানসিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম শিক্ষা দেয়, দুঃখ-কষ্ট ও রোগও আল্লাহর পরীক্ষা। তাই এসব পরিস্থিতিতে ধৈর্যশীল থেকে সওয়াবের আশায় আল্লাহর সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া উচিত। ধৈর্য মানুষকে ইতিবাচক মানসিক অবস্থায় স্থিত করে এবং হতাশা থেকে দূরে রাখে।

চতুর্থত, মানুষকে জীবনের প্রতিটি ঘটনার পেছনে কল্যাণ খুঁজে নিতে উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকার মানসিকতা একদিকে যেমন অন্তরে প্রশান্তি আনে, অন্যদিকে জীবনের কষ্টকে সহজভাবে নিতে সাহায্য করে। এই মনোভাব হতাশা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ডিপ্রেশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক যোগাযোগ। ইসলাম মানুষকে একাকিত্বে না ডুবে থেকে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে বলে। প্রিয়জনের সঙ্গে মেলামেশা, খোলামেলা কথা বলা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়তা করে।

শারীরিক সুশৃঙ্খলতাও মানসিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। সঠিক সময়ে ঘুমানো, নিয়মিত রুটিন মেনে চলা এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন মানসিক চাপ কমায়। ইসলামে পরিপাটি ও সুশৃঙ্খল জীবনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, যা আধুনিক মনোবিজ্ঞানও সমর্থন করে।

তাওবা ও ইস্তিগফারকেও ডিপ্রেশনের চিকিৎসার অংশ হিসেবে দেখা হয়। পাপ ও অপরাধবোধ মানুষের অন্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও গুনাহ থেকে মুক্তির চেষ্টা সেই অস্থিরতা দূর করতে পারে। এভাবেই একজন মানুষ মানসিক স্বস্তি অনুভব করতে পারে।

ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো রোগকে অস্বীকার না করে বরং গ্রহণ করা এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। মানসিক রোগকে লজ্জার বিষয় হিসেবে না দেখে গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করাই হলো পরিপূর্ণ সুস্থতার সঠিক উপায়। ইসলাম চিকিৎসা গ্রহণকে উৎসাহিত করে এবং রোগীকে ধৈর্যের সঙ্গে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে নির্দেশ দেয়।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান যেমন ডিপ্রেশন মোকাবেলায় ওষুধ, থেরাপি ও কাউন্সেলিংয়ের পরামর্শ দেয়, তেমনি ইসলামী শিক্ষাও মানুষকে আধ্যাত্মিক দৃঢ়তা গড়ে তোলার আহ্বান জানায়। মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে হলে উভয় পথের সমন্বয় অপরিহার্য। অর্থাৎ, ডিপ্রেশনের ক্ষেত্রে আধুনিক চিকিৎসার পাশাপাশি ইসলামের আধ্যাত্মিক চিকিৎসাও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে সামাজিক চাপ, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং পারিবারিক সংকট ডিপ্রেশনের মাত্রা বাড়াচ্ছে, সেখানে ইসলামী শিক্ষা মানুষের মানসিক শক্তিকে পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার পাশাপাশি ধর্মীয় মূল্যবোধ চর্চা করলে সমাজে হতাশা, নিরাশা ও অবসাদের প্রকোপ কমতে পারে।

সর্বোপরি বলা যায়, ডিপ্রেশন কোনো অবহেলার বিষয় নয়। এটি একটি জটিল মানসিক রোগ, যার চিকিৎসা প্রয়োজন। তবে মানসিক চিকিৎসার পাশাপাশি ইসলামী জীবনব্যবস্থা ও আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা একজন মানুষকে অবসাদ থেকে বেরিয়ে আসতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ডিপ্রেশনের অন্ধকার দূর করতে হলে আল্লাহর প্রতি আস্থা, ইবাদতের প্রতি দৃঢ়তা, ধৈর্য, সঠিক চিকিৎসা ও সামাজিক বন্ধনের ওপর নির্ভর করতে হবে। এই সমন্বিত জীবনব্যবস্থাই একজন মানুষকে আবারও আশার আলো দেখাতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত