বাংলাদেশের ৭০ ভাগ মানুষ এখনো অক্সিজেন বৈষম্যের শিকার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫৪ বার
বাংলাদেশের ৭০ ভাগ মানুষ এখনো অক্সিজেন বৈষম্যের শিকার

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশে এখনো প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় অক্সিজেন চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত—এই তথ্য দেশের স্বাস্থ্যখাতে এক ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরেছে। জেলা সদর হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে অক্সিজেন সেবা থাকলেও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে এমন ব্যবস্থা এখনো অপ্রতুল। ফলে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র অসুস্থতা বা অস্ত্রোপচারের সময় প্রয়োজনীয় অক্সিজেন না পাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অনুষ্ঠিত দেশের প্রথম “অক্সিজেন সামিট”-এ এই ভয়াবহ চিত্র সামনে আসে। “ন্যাশনাল রোডম্যাপ টু সেফ, অ্যাফর্ডেবল অ্যান্ড রিলায়েবল মেডিকেল অক্সিজেন ফর অল” শীর্ষক এই সম্মেলনের আয়োজন করে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি), দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ, এভরি ব্রেথ কাউন্টস এবং ইউনিটেইড। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান।

বিশ্বজুড়ে অক্সিজেন প্রাপ্তির বৈষম্য তুলে ধরে বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৩৭৪ মিলিয়ন মানুষের তীব্র চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের সময় অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। এই বিপুল সংখ্যক রোগীর জন্য বছরে কমপক্ষে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন কিউবিক মিটার মেডিকেল অক্সিজেনের দরকার হয়। কিন্তু নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো—যেখানে বিশ্বের ৮২ শতাংশ মানুষের বাস—সেই দেশগুলোতেই অক্সিজেন প্রাপ্যতার ঘাটতি সবচেয়ে ভয়াবহ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বিশেষ করে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে অক্সিজেনের অভাব চিকিৎসা ব্যবস্থায় এক বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি করেছে। চিকিৎসাবিদরা মনে করেন, ন্যূনতম বিনিয়োগ ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এই সংকট অনেকাংশে দূর করা সম্ভব, যা প্রতিদিন হাজারো মানুষের জীবন বাঁচাতে সহায়ক হতে পারে।

ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ কমিশনের কমিশনার ড. শামস এল আরেফিন তার উপস্থাপনায় বলেন, “বাংলাদেশসহ অনুরূপ নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে অক্সিজেন থেরাপি সেবায় বড় ধরনের ঘাটতি বিদ্যমান। এখানে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মানুষের অক্সিজেন প্রয়োজন, কিন্তু পর্যাপ্ত সেবা পাচ্ছেন মাত্র ৮৯ মিলিয়ন মানুষ। অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ এখনো অক্সিজেন চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। এই ঘাটতি এইচআইভি বা যক্ষ্মা চিকিৎসার ঘাটতির তুলনায় অনেক বেশি, যা একটি ভয়াবহ বৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, তীব্র অসুস্থতার ক্ষেত্রে আফ্রিকার সাব-সাহারান অঞ্চল সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে, যেখানে প্রয়োজনীয় ২১ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে মাত্র ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন মানুষ অক্সিজেন পাচ্ছেন। দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থাও আশাব্যঞ্জক নয়—এখানে প্রায় ৩২ মিলিয়নের মধ্যে মাত্র ৭ মিলিয়ন মানুষ যথাযথ অক্সিজেন সুবিধা পাচ্ছেন।

ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ কমিশনের আরও এক সদস্য, ড. আহমেদ এহসানূর রহমান, বৈশ্বিক পরিসংখ্যান উপস্থাপন করে বলেন, “বিশ্বে প্রায় ৯ মিলিয়ন মানুষ দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্টজনিত রোগে (সিওপিডি) আক্রান্ত হয়ে নিয়মিত অক্সিজেন ব্যবহার করেন। কিন্তু এদের ৮২ শতাংশই দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়া এবং সাব-সাহারান আফ্রিকার অঞ্চলে বাস করেন, যেখানে অক্সিজেনের সরবরাহ অত্যন্ত সীমিত। অর্থাৎ এই অঞ্চলে অক্সিজেন একটি বিলাসিতা, চিকিৎসা উপকরণ নয়।”

সম্মেলনে বক্তারা আরও বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশে অক্সিজেন সরবরাহের দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা, দক্ষ জনবল ঘাটতি ও জাতীয় অক্সিজেন রোডম্যাপ না থাকা—এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। ফলে হাসপাতাল পর্যায়ে অক্সিজেন থাকলেও তা নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ ও সংরক্ষণের নিশ্চয়তা নেই।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ডা. সায়েদুর রহমান অক্সিজেন উৎপাদন অবকাঠামোর দুর্বলতা তুলে ধরে বলেন, “বর্তমানে দেশে ২৯টি পিএসএ প্লান্ট কার্যকর আছে, তবে আরও ৭০টি প্লান্ট এখনো অচল অবস্থায় রয়েছে। এই প্লান্টগুলো দ্রুত চালু করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো সম্ভব।” তিনি আরও জানান, সরকার একটি “ন্যাশনাল অক্সিজেন নেটওয়ার্ক” গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং অক্সিজেনকে ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ’ হিসেবে ঘোষণা করার উদ্যোগ নিচ্ছে।

আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, “মেডিকেল অক্সিজেনের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ফারাক যতটা কমানো যাবে, তত বেশি প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে অক্সিজেন উৎপাদনে আমরা অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছি, তবে তা পর্যাপ্ত নয়। মানুষের দীর্ঘমেয়াদি অক্সিজেনের প্রয়োজন ক্রমেই বাড়ছে। তাই সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, অক্সিজেনের সহজলভ্যতা কেবল চিকিৎসা নয়, এটি মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায্যতার বিষয়। শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষ অক্সিজেন চিকিৎসায় অনেক বেশি বঞ্চিত। সঠিক পরিকল্পনা ও জাতীয় রোডম্যাপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের অনেক বিশেষজ্ঞই বলছেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় অক্সিজেন সংকটের যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা দেশ পেয়েছিল, সেই শিক্ষা থেকে এখন স্থায়ী সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া জরুরি। কারণ অক্সিজেন কেবল সংকটের সময় নয়, প্রতিদিনের চিকিৎসার অপরিহার্য উপাদান।

দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অক্সিজেন চিকিৎসা সুলভ, নিরাপদ এবং নিরবচ্ছিন্ন করতে না পারলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়—এই ছিল সম্মেলনের মূল বার্তা। বাংলাদেশ যদি এখনই কার্যকর নীতি ও বিনিয়োগে মনোযোগ না দেয়, তবে অক্সিজেন ঘাটতি আগামী বছরগুলোতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, যা জীবন রক্ষার লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত