তালাবদ্ধ গোডাউন থেকে কাঠমিস্ত্রির লাশ উদ্ধার, রহস্য ঘিরে উদ্বেগে গ্রামজুড়ে আতঙ্ক

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৩ বার
তালাবদ্ধ গোডাউন থেকে কাঠমিস্ত্রির লাশ উদ্ধার, রহস্য ঘিরে উদ্বেগে গ্রামজুড়ে আতঙ্ক

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার পশ্চিম মালসাহ দাহ গ্রামের এক নিরিবিলি এলাকায় বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে আটটার দিকে চাঞ্চল্যকর এক ঘটনা ঘটে। একটি তালাবদ্ধ গোডাউনের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় বিপ্লব হোসেন (৫২) নামের এক কাঠমিস্ত্রির মরদেহ। নিঃস্তব্ধ গ্রাম হঠাৎই কাঁপিয়ে তোলে এই মৃত্যুর খবর। স্থানীয়দের চোখে-মুখে আতঙ্ক, আর চারপাশে ভেসে বেড়ায় নানান প্রশ্ন—কে বা কারা এমন নির্মম ঘটনার সঙ্গে জড়িত?

নিহত বিপ্লব হোসেনের বাড়ি বগুড়া সদর উপজেলার। তিনি মৃত আনিসুর রহমানের ছেলে। প্রায় তিন মাস আগে জীবিকার প্রয়োজনে মেহেরপুরে এসে কাজ শুরু করেছিলেন গাংনী উপজেলার পশ্চিম মালসাহ দাহ গ্রামের একটি ফার্নিচারের গোডাউনে। তার সঙ্গে আরও দুই সহযোগী কাজ করতেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। শান্ত-স্বভাবের এই কাঠমিস্ত্রি স্থানীয়দের কাছে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন পরিশ্রমী ও নির্ভরযোগ্য মানুষ হিসেবে। কিন্তু কয়েকদিন ধরে তার দেখা না মেলায় ও মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় বিষয়টি সন্দেহজনক হয়ে ওঠে।

বিপ্লবের পরিবার প্রথমে ধারণা করেছিল, হয়তো তিনি কাজের কোনো প্রয়োজনে বাইরে গেছেন। কিন্তু দিন পেরিয়ে গেলে আর কোনো খোঁজ না পেয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরা গাংনী থানায় যোগাযোগ করেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তালাবদ্ধ গোডাউনের দরজা খুলতেই বেরিয়ে আসে দুর্গন্ধ—আর সেই দুর্গন্ধের উৎসেই মেলে বিপ্লবের নিথর দেহ।

স্থানীয়রা জানান, গোডাউনটি দীর্ঘদিন ধরে ফার্নিচারের কাজের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছিল। বিপ্লব ও তার সহকর্মীরা দিন-রাত সেখানে কাজ করতেন। কিন্তু কয়েকদিন ধরে সেখানে কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছিল না, দেখা যাচ্ছিল না কাউকে। এ অবস্থায় চারপাশে ছড়িয়ে পড়া দুর্গন্ধ গ্রামবাসীর সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয়। পরে পুলিশে খবর দিলে তারা এসে তালা ভেঙে মরদেহ উদ্ধার করে।

মৃতদেহ উদ্ধারের সময় উপস্থিত ছিলেন গ্রামের বেশ কয়েকজন বাসিন্দা। তারা বলেন, “আমরা ভাবছিলাম হয়তো বাইরে কোথাও গেছে। কিন্তু দরজায় তালা, আর গন্ধ বের হতে শুরু করলে বুঝলাম কিছু একটা গড়বড় আছে। পুলিশ এসে যখন দরজা খুলল, তখনই ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে সেই ভয়াবহ দৃশ্য।”

এদিকে বিপ্লবের সঙ্গে কাজ করা দুই সহযোগীর কেউই এখন আর এলাকায় নেই। তাদের হঠাৎ গায়েব হয়ে যাওয়ায় সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে। স্থানীয়রা ধারণা করছেন, হয়তো তাদের কারও সঙ্গে বিপ্লবের কোনো বিবাদ বা আর্থিক লেনদেনের জটিলতা ছিল। পুলিশও ঘটনাটি হত্যা নাকি দুর্ঘটনা, তা খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে।

গাংনী থানার ওসি (তদন্ত) আল মামুন বলেন, “আমরা খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেছি। প্রাথমিকভাবে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।” তিনি আরও জানান, “বিপ্লবের সঙ্গে কাজ করা দুই সহযোগীর খোঁজ আমরা নিচ্ছি। তাদের খুঁজে পেলে অনেক কিছুই পরিষ্কার হবে।”

এই ঘটনার পর গোটা গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। যারা প্রতিদিন বিপ্লবের সঙ্গে দেখা করতেন, তারা এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না যে এত পরিশ্রমী একজন মানুষ এভাবে নিথর হয়ে পড়ে থাকবে। স্থানীয় দোকানদার সাইদুল ইসলাম বলেন, “বিপ্লব ভাই খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কখনো কারও সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ করতে দেখিনি। এমন মানুষকে কে মেরে ফেলবে, আমরা বুঝতে পারছি না।”

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, গোডাউনটি স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর মালিকানাধীন। সেখানে ফার্নিচারের কাজ চলছিল দীর্ঘদিন ধরে। বিপ্লব নিয়মিত ওই গোডাউনে রাতেও থাকতেন কাজের প্রয়োজনে। তাই তার নিখোঁজ হওয়া এবং পরে মরদেহ উদ্ধার, দুটিই অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

গোডাউনের দরজার বাইরে রাখা তালা, দুর্গন্ধ, সহযোগীদের গায়েব হয়ে যাওয়া—সবকিছু মিলিয়ে তদন্তে নতুন মোড় নিচ্ছে বিষয়টি। পুলিশ ইতোমধ্যে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, স্থানীয়দের তথ্য ও ফোন রেকর্ড বিশ্লেষণ শুরু করেছে।

এলাকাবাসী আশা করছে, দ্রুত এই রহস্যের জট খুলে যাবে এবং বিপ্লবের মৃত্যুর পেছনের প্রকৃত কারণ জানা যাবে। তাদের প্রত্যাশা, অপরাধীরা যদি থেকে থাকে, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন দ্রুত তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসে।

শোকাহত পরিবারটি এখন একটিই কথা বলছে—“আমরা শুধু জানতে চাই, কে বা কারা আমাদের প্রিয় মানুষটাকে এভাবে নিয়ে গেল।”

গাংনী উপজেলার শান্ত গ্রাম পশ্চিম মালসাহ দাহে এখন নেমে এসেছে এক গভীর নীরবতা। কাঠের গন্ধে ভরা সেই গোডাউন আজ শুধুই এক করুণ স্মৃতি। পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু গ্রামের মানুষের মুখে একটাই প্রশ্ন—একজন পরিশ্রমী কাঠমিস্ত্রি কীভাবে এমন করুণ পরিণতির শিকার হলেন?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত