প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হবিগঞ্জের ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা। দুপুরের ব্যস্ত সময়ে হঠাৎ প্রচণ্ড আওয়াজ, আর মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন দুই বাসের গলাগলি অবস্থা। কদমতলী এলাকায় ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন দুজন যাত্রী, গুরুতর আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। ঘটনাস্থলে করুণ চিত্র—ছিন্ন সিট-কাপড়, ভাঙা কাঁচ, ছড়িয়ে থাকা যাত্রীদের লাগেজ, আর হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষ।
মঙ্গলবার দুপুর আনুমানিক একটার দিকে এনা পরিবহনের ঢাকা-সিলেটগামী একটি বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা রিয়েল পরিবহনের আরেকটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের তীব্রতা ছিল এতটাই যে দুমড়েমুচড়ে যায় বাস দুটির সামনের অংশ। স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, মুহূর্তের মধ্যে যাত্রীদের আর্তচিৎকার এবং কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। সড়কের দুই পাশে ভিড় জমে যায় উদ্বিগ্ন মানুষের। কেউ পানি দিচ্ছেন আহতদের মুখে, কেউবা ফোন হাতে খবর দিচ্ছেন স্বজনকে।
দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন এবং দ্রুত খবর দেওয়া হয় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাইওয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা এসে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। আহতদের অনেককে দমকল বাহিনীর সদস্যদের কেটে বের করতে হয় বিকৃত বাসের ভেতর থেকে। সবার আগে গুরুতর আহতদের নিকটস্থ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক জানিয়েছেন, কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের সিলেটে স্থানান্তর করা হয়েছে।
নিহত দুই ব্যক্তির পরিচয় এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তাদের মরদেহ হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। আহতদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন সাধারণ যাত্রী—কেউ বাড়ি ফিরছিলেন উৎসব শেষে, কেউ চিকিৎসার কাজে যাচ্ছিলেন সিলেটে, কেউ আবার অফিসের কাজে ফিরছিলেন ঢাকা থেকে। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন স্বজনরা। কারও চোখে শোকের জল, কেউ আবার প্রার্থনায় মগ্ন—প্রার্থনা একটাই, প্রিয়জন যেন বেঁচে যায়।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, মহাসড়কের এই অংশে অতিরিক্ত গতি ও ওভারটেকের প্রতিযোগিতা প্রায় নিয়মিত ঘটনা। বেপরোয়া চালনা, অসতর্কতা এবং মহাসড়কে দীর্ঘদিন ধরে চলমান যানবাহনের চাপ দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। প্রতিদিনই হাজারো যানবাহন ছুটে চলে এ পথে। এমন দুর্ঘটনায় বারবারই হারাচ্ছে প্রাণ সাধারণ মানুষ।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “আমি পাশের দোকানে বসেছিলাম। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ শুনে ছুটে যাই। দেখি দুই বাস একদম মুখোমুখি লেগে আছে। অনেকেই চিৎকার করছেন। কিছু যাত্রী কাচে আটকে গেছেন। আমরা যতটা পারি সাহায্য করেছি, কিন্তু দৃশ্যটা খুবই ভয়ংকর ছিল।”
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ রুটটি দীর্ঘদিন ধরেই দুর্ঘটনা-প্রবণ হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নয়ন ও সংস্কার হলেও অনেক সময় চালকদের অসতর্কতা, যান্ত্রিক ত্রুটি এবং মহাসড়কে ট্রাফিক আইন অমান্য করায় এমন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
হাইওয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অতিরিক্ত গতিতে চলার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সংঘর্ষটি ঘটে। তবে বিস্তারিত তদন্ত চলছে। তিনি আরও জানান, রাস্তার দুই পাশে দ্রুত পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং যান চলাচল স্বাভাবিক করতে কাজ করা হয়। দুর্ঘটনার পর কয়েক ঘণ্টা মহাসড়কে যানজটের সৃষ্টি হলেও বিকেলে ধীরে ধীরে চলাচল স্বাভাবিক হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক আহত যাত্রীর কণ্ঠে ছিল বেঁচে ফেরার বেদনা। তিনি বলেন, “আমাদের বাসটা একদম সোজা যাচ্ছিল। হঠাৎ সামনে আরেকটা বাস এসে ধাক্কা দিল। আমি কীভাবে বেঁচে আছি তা বুঝতেই পারছি না। চোখের সামনে মানুষকে মরতে দেখলাম।” তার কণ্ঠে আতঙ্ক, শরীরে ব্যথা, তবুও ফিরে আসার কৃতজ্ঞতা।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার নির্মমতা এখন আর নতুন নয়। প্রতিদিনের খবরে মৃত্যুর মিছিল, আহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলছেন, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর ব্যবস্থা, ট্রাফিক আইন প্রয়োগ, চালকদের দায়িত্ববোধ এবং যানের নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে পথচারী থেকে শুরু করে যাত্রী—সবাইকে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
প্রতিটি দুর্ঘটনা শুধু সংখ্যা নয়—এগুলোর পেছনে থাকে ভেঙে যাওয়া পরিবার, অকারণ মৃত্যু, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর অসংখ্য স্বপ্নের সমাধি। সেই দিক থেকে আজকের হবিগঞ্জের এই দুর্ঘটনা আবারও সবার সামনে তুলে ধরছে সড়কের ভয়াবহ বাস্তবতা।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মহাসড়ক ফিরে পেয়েছে স্বাভাবিকতা। তবে স্বজন হারানো পরিবারগুলোর জন্য এই দিনটি হয়ে রইল কালো দিন। আহতদের কান্না, মানুষের আতঙ্ক, ইঞ্জিনের বিকট শব্দ আর ভুঁইফোটা কাচের ওপর পড়ে থাকা রক্ত—এই দুর্ঘটনার গল্প হয়তো কালকের মধ্যে সংবাদ পৃষ্ঠা থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু যারা আজকের এই বিকেলটি সরাসরি দেখেছেন, তাদের মনে থেকে যাবে এক ভয়াবহ স্মৃতি।
আবারও প্রশ্ন ফিরে আসে—কত মৃত্যু হলে থামবে এই দুর্ঘটনা? কত ঘরে শোক নামলে জেগে উঠবে সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিবেক? উত্তর খোঁজার এই যাত্রা দীর্ঘ, কিন্তু প্রতিটি জীবনই যে মূল্যবান, তা যেন আজকের ঘটনার প্রতিটি সেকেন্ড আমাদের মনে করিয়ে দিল।
আশা, আহতরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন এবং এমন শোকাবহ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। বাংলাদেশের প্রতিটি যাত্রাই নিরাপদ হওয়ার অধিকার রাখে—এই প্রার্থনা আজ নতুন করে উচ্চারিত হোক।