বৈদ্যনাথতলার সেই ঐতিহাসিক শপথের গল্প

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১১ বার
বৈদ্যনাথতলার সেই ঐতিহাসিক শপথের গল্প

প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার একটি নিরিবিলি আমবাগানে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার, যা পরবর্তীতে পরিচিত হয় মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ নামে। সেই মুহূর্ত শুধু একটি প্রশাসনিক ঘোষণা ছিল না, বরং একটি জাতির স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক যাত্রার সূচনা।

তৎকালীন পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণ, বিমান হামলার ভয় এবং সীমান্তবর্তী এলাকার অস্থিরতার মধ্যেও এই ঐতিহাসিক শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান তখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। তার অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

সেই দিনের আনুষ্ঠানিকতায় তিনি উপস্থিত জনসমাগম ও সাংবাদিকদের সামনে ঘোষণা করেন অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর নাম—তাজউদ্দীন আহমেদ। মুহূর্তটি হাততালিতে মুখর হয়ে ওঠে। এরপর মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় খন্দকার মোশতাক আহমেদ, এ এইচ এম কামরুজ্জামান এবং এম মনসুর আলী-কে। সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে ঘোষণা করা হয় এ কে এম ওসমানী-এর নাম।

এই পুরো আয়োজনের পেছনে ছিল গভীর পরিকল্পনা, গোপন যোগাযোগ এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের প্রশাসনিক সমন্বয়। মেহেরপুরের তৎকালীন প্রশাসনিক কর্মকর্তা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী সেই সময়ের স্মৃতিচারণে জানান, পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রগতি, আকাশপথে হামলার আশঙ্কা এবং সীমান্তে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই এই আয়োজন সম্পন্ন হয়।

তিনি বলেন, বৈদ্যনাথতলার আমবাগানটি বেছে নেওয়া হয়েছিল নিরাপত্তা ও কৌশলগত সুবিধার কারণে। ভারতের সীমান্ত থেকে সহজে প্রবেশযোগ্য, আবার বাংলাদেশের ভেতর থেকে দুর্গম হওয়ায় এটি ছিল তুলনামূলকভাবে নিরাপদ স্থান। স্থানীয় প্রশাসন, সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সহযোগিতায় এই স্থান চূড়ান্ত করা হয়।

অনুষ্ঠানটি সম্পূর্ণ গোপনীয়তার মধ্যে প্রস্তুত করা হয়। সীমিত সংখ্যক নিরাপত্তা সদস্য, আনসার ও ইপিআর সদস্যদের মাধ্যমে একটি প্রতীকী নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়। ছোট একটি মঞ্চ তৈরি করা হয়, যেখানে কয়েকটি চেয়ারের ব্যবস্থা ছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য একটি চেয়ার ফাঁকা রাখা হয়, যা তাঁর অনুপস্থিতিতেও তাঁর নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

সকাল ৯টার দিকে অনুষ্ঠান শুরু হলে ধীরে ধীরে উপস্থিত হতে থাকেন আমন্ত্রিত অতিথি, সাংবাদিক এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। সেই সময় গণপরিষদের স্পিকার ইউসুফ আলী ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ পাঠ করেন এবং মন্ত্রীদের শপথ বাক্য করান।

অনুষ্ঠানস্থলে আনুমানিক শতাধিক দেশি-বিদেশি সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন, যা এই ঘটনার আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। তাজউদ্দীন আহমেদ তাঁর বক্তব্যে উপস্থিত সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে উপস্থিত হয়েছেন।

শপথ অনুষ্ঠানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নিরাপত্তা ও প্রতীকী সামরিক উপস্থিতি। যদিও পরিকল্পনা ছিল গার্ড অব অনার প্রদান করবে ইপিআর বাহিনী, কিন্তু তারা সময়মতো পৌঁছাতে না পারায় বিকল্প হিসেবে আনসার সদস্যদের মাধ্যমে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে এটি সম্পন্ন হয়, যা পরিস্থিতির বাস্তবতা ও সংকটকে তুলে ধরে।

অনুষ্ঠানটি দীর্ঘস্থায়ী ছিল না। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দ্রুত আয়োজন সম্পন্ন করে সবাই নিরাপদে স্থান ত্যাগ করেন। তবুও সেই স্বল্প সময়ের মধ্যেই একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ভিত্তি স্থাপিত হয়।

পরবর্তীতে এই সরকারই পরিচালনা করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। এই শপথের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবিটি আরও দৃঢ়ভাবে উপস্থাপিত হয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়।

সেই দিনের প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, পুরো পরিবেশ ছিল একদিকে উত্তেজনাপূর্ণ, অন্যদিকে আশাবাদে ভরপুর। প্রকৃতির নীরবতা, আমগাছের ছায়া আর ইতিহাসের ভার মিলিয়ে এক অদ্ভুত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। অনেকেই মনে করেন, সেই মুহূর্ত ছিল এক জাতির জন্মঘোষণার বাস্তব রূপ।

তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর ভাষায়, “মনে হচ্ছিল প্রকৃতিও যেন এই ঘটনার সাক্ষী হতে চায়। সাধারণ একটি গ্রামীণ আমবাগান থেকে শুরু হওয়া সেই শপথই পরবর্তীতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করে।”

সব মিলিয়ে, বৈদ্যনাথতলার সেই ঐতিহাসিক দিন শুধু একটি প্রশাসনিক শপথ ছিল না, বরং তা ছিল আত্মত্যাগ, সাহস এবং স্বাধীনতার স্বপ্নের বাস্তব রূপায়ণ। আজও সেই আমবাগান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অমর স্মৃতিচিহ্ন হয়ে আছে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে স্বাধীনতার চেতনায় অনুপ্রাণিত করে চলেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত