আল্লাহই বিশ্বব্যবস্থার একমাত্র নিয়ন্ত্রক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১৩ বার
আল্লাহই বিশ্বব্যবস্থার একমাত্র নিয়ন্ত্রক

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পবিত্র কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী সমগ্র আসমান ও জমিন এবং এর অন্তর্গত সব সৃষ্টিজগৎ একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলার নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। মানুষের বিশ্বাস, চিন্তা ও যুক্তিকে সুসংগঠিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়াত হিসেবে পবিত্র কোরআনের Surah Al-Anbiya-এর ২২ নম্বর আয়াত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যেখানে আল্লাহ তাআলা বলেন, যদি আসমান ও জমিনে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য থাকত, তবে সমগ্র বিশ্বব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যেত।

এই আয়াতের মাধ্যমে ইসলামের মৌলিক আকিদা—তাওহিদ বা একত্ববাদ—আরও সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইসলামি ব্যাখ্যাকারদের মতে, এই আয়াত শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং একটি শক্তিশালী যুক্তিবাদী ব্যাখ্যাও প্রদান করে, যা মানুষের চিন্তাশক্তিকে জাগ্রত করে।

আয়াতটির সরল অর্থ অনুযায়ী, যদি একাধিক ইলাহ বা উপাস্য সত্যিই থাকত, তাহলে তাদের ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তের মধ্যে পারস্পরিক সংঘর্ষ সৃষ্টি হতো। কারণ প্রতিটি সত্তা নিজ নিজ ক্ষমতা ও ইচ্ছা অনুযায়ী বিশ্ব পরিচালনা করতে চাইত। ফলে এই বিশাল সৃষ্টিজগতে কখনোই শৃঙ্খলা বজায় থাকত না, বরং ধ্বংস ও বিশৃঙ্খলা অনিবার্য হয়ে উঠত।

তাফসির বিশ্লেষকদের মতে, এই যুক্তিটি অত্যন্ত গভীর ও যৌক্তিক। তারা বলেন, যদি একাধিক সর্বশক্তিমান সত্তা থাকত, তবে তাদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হতো। একজন যা চাইত, অন্যজন তা অস্বীকার করতে পারত। এই বিরোধই শেষ পর্যন্ত পুরো সৃষ্টিজগতকে অস্থিতিশীল করে তুলত। কিন্তু বাস্তবে তা কখনো ঘটেনি, যা প্রমাণ করে যে সৃষ্টিজগতের নিয়ন্ত্রণ একমাত্র আল্লাহর হাতে।

এই বিষয়ে ইসলামি ব্যাখ্যায় বলা হয়, আল্লাহ তাআলা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং তাঁর ইচ্ছার বাইরে কিছুই ঘটে না। তিনি যা আদেশ করেন, তা অবধারিতভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং কেউ তা প্রতিরোধ করতে পারে না। একইভাবে, তিনি যা নিষেধ করেন, তা বাস্তবায়নের ক্ষমতাও কারও নেই।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সঙ্গে কোনো অংশীদারও নেই। যদি থাকত, তবে প্রত্যেক ইলাহ নিজের সৃষ্টি নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অপরের উপর প্রাধান্য বিস্তার করার চেষ্টা করত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্বজগৎ একক নিয়মে এবং সুসংগঠিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে, যা একক সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে প্রমাণ করে।

ইসলামি পণ্ডিতদের মতে, বিশ্বব্যবস্থার প্রতিটি উপাদান—সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত, দিন-রাতের পরিবর্তন, ঋতুচক্র এবং মহাকাশের নিয়মিত গতিবিধি—সবকিছুই একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। এই নিখুঁত ব্যবস্থাই প্রমাণ করে যে এর পেছনে একজন সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান নিয়ন্ত্রক আছেন।

তাফসিরে Tafsir Ibn Kathir এবং অন্যান্য ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, যদি একাধিক সত্তা বিশ্ব পরিচালনা করত, তবে তাদের মধ্যে মতবিরোধ অনিবার্য হতো। কারণ প্রতিটি সত্তা স্বতন্ত্রভাবে সিদ্ধান্ত নিতে চাইত। ফলে সৃষ্টিজগৎ স্থিতিশীল থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ত।

এই আয়াতের মাধ্যমে ইসলাম মানুষকে শুধুমাত্র বিশ্বাসের দিকে আহ্বান করে না, বরং যুক্তি ও চিন্তার মাধ্যমে সত্যকে উপলব্ধি করার দিকেও উৎসাহিত করে। এটি মানবজাতিকে চিন্তা করতে শেখায় যে, এত সুসংগঠিত ও নিখুঁত একটি বিশ্বব্যবস্থা কখনোই এলোমেলো বা বহু নিয়ন্ত্রকের অধীনে চলতে পারে না।

ইসলামি শিক্ষায় এটিও বলা হয়েছে যে, আল্লাহ সকল প্রকার অপবাদ ও সীমাবদ্ধতা থেকে পবিত্র। মানুষ আল্লাহ সম্পর্কে যেসব ভুল ধারণা বা শিরকপূর্ণ বিশ্বাস তৈরি করে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আল্লাহর একত্ববাদের ধারণা শুধু ধর্মীয় নয়, বরং যুক্তিনির্ভর একটি বাস্তব সত্য।

ধর্মীয় বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই আয়াত মানবজাতিকে গভীরভাবে চিন্তা করতে শেখায়। এটি মানুষকে প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করে—যদি বিশ্বে একাধিক নিয়ন্ত্রক থাকত, তবে কীভাবে এত শৃঙ্খলা বজায় থাকত? এই প্রশ্নের উত্তরই ইসলামের মূল বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে।

আজকের আধুনিক বিজ্ঞানও মহাবিশ্বের নিয়মিত শৃঙ্খলা ও গাণিতিক নিখুঁততা স্বীকার করে। গ্রহ-নক্ষত্রের গতি, প্রাকৃতিক নিয়ম এবং জৈবিক ভারসাম্য সবকিছুই একটি নির্দিষ্ট নিয়মের অধীনে চলছে। ধর্মীয় ব্যাখ্যায় এটিকে আল্লাহর সৃষ্ট নিখুঁত ব্যবস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়।

সবশেষে বলা যায়, এই আয়াত কেবল একটি ধর্মীয় বক্তব্য নয়, বরং এটি একটি দার্শনিক ও যুক্তিবাদী ঘোষণা, যা মানবজাতিকে একক সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে সহায়তা করে। এটি বিশ্বাস, যুক্তি এবং প্রকৃতির বাস্তবতাকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়, যা ইসলামের তাওহিদের মূল বার্তাকে আরও সুস্পষ্ট করে তোলে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত