প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নরসিংদীতে আবারও প্রকাশ্য সড়কে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। সোমবার (২০ এপ্রিল) রাত ৮টার দিকে নরসিংদী-মদনগঞ্জ সড়কের ৫ নম্বর সেতু সংলগ্ন এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হন এক টেক্সটাইল মিলের কেয়ারটেকার। নিহতের নাম মুজিবুর রহমান (৫৫)।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, মুজিবুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে মাধবদী কালীবাড়ি এলাকার একটি ডাইং কারখানায় কেয়ারটেকার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি মাধবদীর বিরামপুর সংলগ্ন বাহাদুরপুর এলাকায়। প্রতিদিনের মতোই সেদিনও তিনি কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। কিন্তু পথেই তাকে জীবন দিতে হলো নির্মম হামলার শিকার হয়ে।
ঘটনার বর্ণনায় জানা যায়, ওইদিন রাতের দিকে তিনি নরসিংদী শহর থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে মাধবদীর উদ্দেশ্যে রওনা দেন। গাড়িটি যখন পৌরসভার ময়লার স্তূপ সংলগ্ন ৫ নম্বর সেতু এলাকায় পৌঁছায়, তখন একদল অজ্ঞাতপরিচয় সন্ত্রাসী সিএনজির গতিরোধ করে। তারা জোরপূর্বক মুজিবুর রহমানকে গাড়ি থেকে নামিয়ে আনে এবং অতর্কিতভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়।
চোখের পলকে ঘটে যাওয়া এই হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সন্ত্রাসীরা তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। ঘটনাটি এতটাই আকস্মিক ও ভয়াবহ ছিল যে আশপাশের লোকজনও প্রথমে এগিয়ে আসতে সাহস পাননি।
পরবর্তীতে এক সিএনজিচালক মানবিকতার তাগিদে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে নরসিংদী সদর হাসপাতাল-এ নিয়ে যান। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। উদ্ধারকারী ওই চালক নিজের পরিচয় প্রকাশ না করেই দ্রুত সেখান থেকে চলে যান বলে জানা গেছে, যা এই ঘটনার রহস্য আরও ঘনীভূত করেছে।
এই হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এমন নৃশংস ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন। অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, প্রকাশ্যে এমন হত্যাকাণ্ড ঘটতে থাকলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে।
এ বিষয়ে নরসিংদী সদর মডেল থানা-এর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ আর এম আল মামুন জানান, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ শুরু করেছে। তিনি বলেন, নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, এটি পরিকল্পিত হামলা হতে পারে। তবে ব্যক্তিগত শত্রুতা, পূর্ব বিরোধ কিংবা অন্য কোনো কারণ—কোনটি এই হত্যার পেছনে রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছেন এবং আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখার কাজও চলছে বলে জানা গেছে।
নিহতের পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনরা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে ভেঙে পড়েছেন। তাদের দাবি, মুজিবুর রহমান একজন শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন এবং কারও সঙ্গে তার কোনো বিরোধ ছিল না। তাই হঠাৎ করে তাকে কেন টার্গেট করা হলো, তা তারা বুঝতে পারছেন না।
স্থানীয়দের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সড়কে ছিনতাই ও সহিংসতার ঘটনা কিছুটা বেড়েছে। রাতের বেলায় অনেক এলাকায় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এই ঘটনার পর তারা আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন এবং প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের হত্যাকাণ্ড শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত না হলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে তারা মনে করেন, স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে টহল জোরদার করা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধ শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এতে করে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে।
এই ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মনে যে ভীতি তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপ এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তারই পারে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে।
সবশেষে বলা যায়, মুজিবুর রহমানের এই মর্মান্তিক মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো এলাকার জন্যই একটি বেদনাদায়ক ঘটনা। এখন সবার প্রত্যাশা, দ্রুত সময়ের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন হবে এবং দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।