অক্সফোর্ডে বিক্ষোভের মুখে হাসনাত-সাদিক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬
  • ২৮ বার

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী অক্সফোর্ড ইউনিয়ন সোসাইটিতে বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে আয়োজিত এক প্যানেল আলোচনায় অংশ নিতে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি সাদিক কায়েম। স্থানীয় সময় রোববার সন্ধ্যায় অক্সফোর্ড ইউনিয়নের বাইরে এ বিক্ষোভ হয়। সেখানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুক্তরাজ্য শাখার নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন বলে জানা গেছে।

প্যানেল আলোচনার শিরোনাম ছিল ‘The Student-Led Uprising and the Future of Post-Revolutionary Bangladesh’। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান, ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাব, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং আন্দোলন-পরবর্তী বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়। এই আলোচনায় অংশ নেন হাসনাত আবদুল্লাহ ও সাদিক কায়েমসহ বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন তরুণ রাজনৈতিক মুখ।

অক্সফোর্ড ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের জন্য পরিচিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতা, রাজনীতিক, লেখক, অধিকারকর্মী ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্বও এই মঞ্চে বক্তব্য দিয়েছেন। তাই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে সেখানে প্যানেল আয়োজন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। তবে অনুষ্ঠান ঘিরে বাইরে বিক্ষোভ হওয়ায় আলোচনাটি নতুন মাত্রা পায়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, অক্সফোর্ড ইউনিয়নের বাইরে একদল বিক্ষোভকারী ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে অবস্থান করছেন। তাদের হাতে শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। বিক্ষোভকারীরা হাসনাত আবদুল্লাহ ও সাদিক কায়েমকে উদ্দেশ করে বিভিন্ন স্লোগান দেন। কিছু ভিডিওতে হাসনাত আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করে ব্যঙ্গাত্মক ও রাজনৈতিক স্লোগান দিতেও দেখা যায়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাজ্য পুলিশ সেখানে উপস্থিত ছিল। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের শান্ত থাকতে অনুরোধ করে এবং অনুষ্ঠানস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের সংঘর্ষ বা আটক হওয়ার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। অনুষ্ঠানটি শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এখন দেশের রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আলোচনাতেও জায়গা করে নিয়েছে। ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান এবং গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রশ্ন নিয়ে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও নীতি আলোচনায় আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। অক্সফোর্ড ইউনিয়নের এই আয়োজন সেই আগ্রহেরই অংশ।

হাসনাত আবদুল্লাহ জুলাই আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত সংগঠক হিসেবে পরিচিত। পরে তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অন্যদিকে সাদিক কায়েম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি হিসেবে ছাত্ররাজনীতির নতুন প্রজন্মের মুখ হিসেবে আলোচনায় আসেন। তাদের অক্সফোর্ডে উপস্থিতি তাই শুধু ব্যক্তিগত সফর নয়, বরং জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বয়ান আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার একটি সুযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছিল।

তবে প্রবাসী রাজনীতির বাস্তবতা ভিন্ন। যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক ধারার অনুসারীরা সেখানে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রবাসেও প্রায়ই প্রতিফলিত হয়। অক্সফোর্ডের এই বিক্ষোভ সেই ধারাবাহিকতার আরেক উদাহরণ।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুক্তরাজ্য শাখার নেতাকর্মীরা কেন বিক্ষোভ করেছেন, তা তাদের স্লোগান ও প্ল্যাকার্ড থেকেই কিছুটা বোঝা যায়। তারা জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন ও বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান জানাতে চেয়েছেন। তাদের চোখে হাসনাত ও সাদিক জুলাই আন্দোলনের এমন মুখ, যাদের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে তারা আপত্তি জানাচ্ছেন। অন্যদিকে জুলাই আন্দোলনের সমর্থকেরা এই বিক্ষোভকে পুরোনো শাসনব্যবস্থার পক্ষের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখছেন।

এ ধরনের বিক্ষোভ গণতান্ত্রিক দেশে অস্বাভাবিক নয়। যুক্তরাজ্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার রয়েছে। তবে কোনো বিক্ষোভ যদি ব্যক্তিগত আক্রমণ, হুমকি বা সহিংসতার দিকে যায়, তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নেয়। অক্সফোর্ডের ঘটনাতেও পুলিশ উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি নজরে রাখে। এতে বোঝা যায়, আয়োজনের নিরাপত্তা নিয়ে কর্তৃপক্ষ সতর্ক ছিল।

ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনীতিতেও আলোচনা তৈরি করেছে। কেউ বলছেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আলোচনা হওয়া একটি বড় বিষয়। তরুণ নেতাদের সেখানে অংশগ্রহণ আন্দোলনের বৈশ্বিক স্বীকৃতির ইঙ্গিত দেয়। আবার কেউ বলছেন, বিদেশের মাটিতেও বাংলাদেশের বিভক্ত রাজনীতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একটি প্যানেল আলোচনা ঘিরে এমন বিক্ষোভ দেখাচ্ছে, জুলাই-পরবর্তী রাজনীতির ক্ষত এখনো গভীর।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে দেশে এখনো একক বয়ান তৈরি হয়নি। আন্দোলনের সমর্থকেরা একে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগপন্থীরা একে ক্ষমতার পালাবদল, রাজনৈতিক প্রতিশোধ বা অস্থিরতার সূচনা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। এই দুই অবস্থানের সংঘাত শুধু দেশে নয়, প্রবাসী জনপরিসরেও দেখা যাচ্ছে।

অক্সফোর্ড ইউনিয়নের মতো একটি মঞ্চে এই আলোচনা হওয়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে বক্তারা শুধু দেশীয় রাজনীতির ভাষায় কথা বলেন না। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, গবেষক, নীতি-পর্যবেক্ষক ও গণতন্ত্র নিয়ে আগ্রহী শ্রোতাদের সামনে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। জুলাই আন্দোলনের পটভূমি, ছাত্রদের ভূমিকা, রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া, পরবর্তী রাজনৈতিক কাঠামো এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রশ্ন আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যাখ্যা করার সুযোগ তৈরি হয়।

তবে এই সুযোগের সঙ্গে দায়িত্বও আছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে বক্তব্য দিতে গেলে আবেগের পাশাপাশি তথ্য, যুক্তি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা জরুরি। শুধু অতীতের আন্দোলন নয়, আন্দোলন-পরবর্তী রাষ্ট্র কীভাবে ন্যায়বিচার, অন্তর্ভুক্তি, নির্বাচন, প্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং মানবাধিকার রক্ষা করবে, সেটিও বড় প্রশ্ন। হাসনাত-সাদিকদের মতো নতুন প্রজন্মের নেতাদের সামনে সেই প্রশ্নই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

বিক্ষোভের ঘটনাটি আরেকটি বিষয় সামনে এনেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিরোধ এখন আর দেশের ভৌগোলিক সীমানায় আটকে নেই। লন্ডন, নিউইয়র্ক, টরন্টো, সিডনি বা দুবাইয়ের মতো জায়গায়ও বাংলাদেশের রাজনীতি সক্রিয়। প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠান না। তারা মতামত দেন, লবিং করেন, প্রচার চালান এবং কখনো কখনো আন্তর্জাতিক জনমতেও প্রভাব ফেলেন। তাই বিদেশে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের সফর এখন আরও বেশি নজরদারির মধ্যে থাকে।

এখন পর্যন্ত হাসনাত আবদুল্লাহ বা সাদিক কায়েমের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ নিয়ে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। আয়োজক অক্সফোর্ড ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও পূর্ণ বিবৃতি প্রকাশের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভ সত্ত্বেও প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলে মূল আলোচনার পাশাপাশি বিক্ষোভের ঘটনাও খবরের কেন্দ্রে চলে এসেছে।

এই ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য তাই দুই স্তরে দেখা যায়। একদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান আন্তর্জাতিক একাডেমিক ও নীতিগত আলোচনায় প্রবেশ করছে। অন্যদিকে সেই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে বিরোধও প্রবাসী রাজনীতিতে সক্রিয়। অক্সফোর্ডের বিক্ষোভ দেখাল, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতি শুধু সংসদ, আদালত বা রাজপথে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এখন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্চ, প্রবাসী কমিউনিটি এবং বৈশ্বিক জনপরিসরেও আলোচনার বিষয়।

সব মিলিয়ে অক্সফোর্ড ইউনিয়নে হাসনাত আবদুল্লাহ ও সাদিক কায়েমের অংশগ্রহণ এবং বাইরে বিক্ষোভের ঘটনা বাংলাদেশের জুলাই-পরবর্তী রাজনীতির জটিল বাস্তবতা তুলে ধরেছে। একদিকে নতুন রাজনৈতিক প্রজন্ম নিজেদের অবস্থান আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরছে। অন্যদিকে পুরোনো রাজনৈতিক শক্তির সমর্থকেরা প্রবাসেও প্রতিবাদ জানাচ্ছে। এই দ্বন্দ্বই দেখায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক অভিঘাত এখনো শেষ হয়নি। বরং তা দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও নতুন আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত