ইসলামী ব্যাংককে ২৫০০ কোটি টাকা ধার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬
  • ২ বার

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

তারল্য সংকট কাটাতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে আরও ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিশেষ ঋণ সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক এই ব্যাংকটি সাম্প্রতিক সময়ে আমানত উত্তোলনের বাড়তি চাপের মুখে পড়ে। সেই চাপ সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ সহায়তা চেয়েছিল ব্যাংকটি। এর বিপরীতে প্রথম ধাপে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বিশেষ তারল্য সহায়তার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, আমানতকারীদের স্বার্থ, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং জনস্বার্থ বিবেচনায় এই সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের নগদ অর্থের ওপর চাপ তৈরি হওয়ায় কয়েকটি শাখা ও এটিএম বুথে গ্রাহকদের ভোগান্তির খবর আসে। এরপরই ব্যাংকটির পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ইসলামী ব্যাংক দেশের ব্যাংকিং খাতের একটি বড় প্রতিষ্ঠান। লাখো গ্রাহক এই ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত। ব্যক্তি আমানত, ব্যবসায়িক হিসাব, রেমিট্যান্স, বিনিয়োগ এবং শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং সেবায় ব্যাংকটির বড় ভূমিকা আছে। তাই ব্যাংকটির তারল্য সংকট শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়। এটি পুরো ব্যাংকিং খাতের আস্থা, আমানতকারীর নিরাপত্তা এবং আর্থিক স্থিতির সঙ্গে যুক্ত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুনের প্রথম ৯ দিনে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা আমানত তুলে নেন গ্রাহকরা। ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ হিসাবেও দেখা গেছে, ১ জুন থেকে ৭ জুন পর্যন্ত আমানত কমেছে ৪ হাজার ২০৪ কোটি টাকা। পরের দুই দিনে আরও প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন হয়। এত অল্প সময়ে বড় অঙ্কের অর্থ বেরিয়ে যাওয়ায় ব্যাংকটির নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়।

ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকটের অর্থ হলো, গ্রাহকের টাকা ব্যাংকে নেই এমন নয়। বরং ব্যাংকের সম্পদের বড় অংশ ঋণ, বিনিয়োগ বা অন্যান্য খাতে আটকে থাকে। ফলে একসঙ্গে অনেক গ্রাহক নগদ টাকা তুলতে চাইলে ব্যাংকের তাৎক্ষণিক নগদ ব্যবস্থাপনায় চাপ পড়ে। ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও সেই পরিস্থিতিই দেখা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তারল্য সহায়তার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ব্যাংকটির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নগদ সহায়তা বিবেচনা করবে। এরপর ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈঠক হয়। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং উপব্যবস্থাপনা পরিচালকরা বৈঠকে অংশ নেন বলে জানা গেছে।

এই বৈঠকের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকটির জন্য বিশেষ সহায়তার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো পুরো ১০ হাজার কোটি টাকা দেয়নি। প্রথম ধাপে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে পরবর্তী সময়ে আরও সহায়তার বিষয় বিবেচনা করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

তারল্য সহায়তার পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নিয়েও বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদের সব পরিচালকের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক কম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারা এবং ৪৭(৩) ধারায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর অর্পিত ক্ষমতাবলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ব্যাংক-কম্পানির স্বার্থ, আমানতকারীদের স্বার্থ এবং জনস্বার্থ বিবেচনায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

পর্ষদের সার্বিক দায়িত্ব পালনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি ব্যাংক কম্পানি আইন অনুযায়ী পর্ষদের যাবতীয় ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন। এর অর্থ, ইসলামী ব্যাংকের নীতি সিদ্ধান্ত, পরিচালনা তদারকি এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এখন সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারির আওতায় এসেছে।

ব্যাংকটির পর্ষদ বাতিলের সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং খাতে বড় বার্তা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত কোনো ব্যাংকের পরিচালনা কাঠামোয় এমন হস্তক্ষেপ করে তখনই, যখন ওই ব্যাংকের স্বার্থ, আমানতকারীর নিরাপত্তা বা আর্থিক স্থিতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়। ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক আমানত উত্তোলন, তারল্য চাপ এবং আস্থার সংকট মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আমানতকারীর আস্থা ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে গুজব, অনিশ্চয়তা বা ব্যবস্থাপনা সংকট তৈরি হলে গ্রাহকেরা দ্রুত টাকা তুলতে শুরু করেন। এতে সুস্থ ব্যাংকও চাপের মুখে পড়ে। তাই ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্রুত পদক্ষেপ আমানতকারীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে বিশেষ ঋণ সহায়তা শুধু সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকটির আর্থিক স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনতে হলে সুশাসন, স্বচ্ছ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং খেলাপি বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ দরকার। বিশেষজ্ঞদের মতে, তারল্য সহায়তা দিয়ে নগদ চাপ কমানো সম্ভব। কিন্তু ব্যাংকের মূল সমস্যা যদি ব্যবস্থাপনা, আস্থা বা সম্পদের মানে থাকে, তাহলে গভীর সংস্কার ছাড়া স্থায়ী সমাধান আসবে না।

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সাম্প্রতিক উদ্বেগের পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করেছে। ব্যাংকটির পরিচালনা, বড় ঋণ বা বিনিয়োগ, আমানতকারীর আস্থা এবং বাজারে ছড়ানো নানা আলোচনার কারণে গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ে। এরপর অনেক গ্রাহক একসঙ্গে টাকা তুলতে শুরু করেন। ব্যাংকিং খাতে এই ধরনের আচরণ খুব সংবেদনশীল। কারণ একজন গ্রাহকের আতঙ্ক দ্রুত হাজারো গ্রাহকের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব এখন দ্বিমুখী। একদিকে আমানতকারীদের টাকা নিরাপদ আছে, এই বার্তা পরিষ্কারভাবে দিতে হবে। অন্যদিকে ব্যাংকটির ভেতরের প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজন হলে বিনিয়োগ পোর্টফোলিও পর্যালোচনা, বড় গ্রাহকের দায়-দেনা যাচাই, শাখাভিত্তিক নগদ প্রবাহ পর্যবেক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার দায় নির্ধারণ করতে হবে।

আমানতকারীদের জন্যও সতর্ক থাকার সময় এটি। ব্যাংকিং খাতে গুজব অনেক সময় বাস্তব সংকটের চেয়েও বেশি ক্ষতি করে। কোনো ব্যাংকে সমস্যা দেখা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, ব্যাংকের নিজস্ব ঘোষণা এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুসরণ করা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অযাচাইকৃত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিলে নিজেরও ক্ষতি হতে পারে, ব্যাংকিং খাতও অস্থির হতে পারে।

অন্যদিকে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে ইসলামী ব্যাংককেও দ্রুত স্বচ্ছ যোগাযোগ করতে হবে। শাখা ও এটিএম বুথে নগদ সেবা স্বাভাবিক রাখা, বড় অঙ্কের টাকা উত্তোলনে পূর্বপ্রস্তুতি রাখা, আমানতকারীদের সঙ্গে পরিষ্কারভাবে কথা বলা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকিতে আর্থিক অবস্থার হালনাগাদ তথ্য দেওয়া জরুরি। ব্যাংকের নীরবতা অনেক সময় গুজব বাড়ায়।

এই ঘটনার আরেকটি বড় শিক্ষা হলো, ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের বিকল্প নেই। বড় ব্যাংক হলে ঝুঁকিও বড় হয়। তাই পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা, ঋণ অনুমোদন, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ সব জায়গায় কঠোর নজরদারি দরকার। একটি ব্যাংকের ভুল সিদ্ধান্ত কখনো কখনো পুরো খাতের আস্থাকে নড়বড়ে করে দিতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইসলামী ব্যাংকের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রেমিট্যান্স, ক্ষুদ্র ব্যবসা, আমানত, আমদানি-রপ্তানি এবং শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগে ব্যাংকটির ভূমিকা দীর্ঘদিনের। তাই ব্যাংকটির সংকট দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা শুধু আমানতকারীর স্বার্থ নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির স্বার্থও।

সব মিলিয়ে ইসলামী ব্যাংককে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিশেষ ধার দেওয়ার সিদ্ধান্ত একটি জরুরি সহায়তা পদক্ষেপ। তবে এটি শেষ সমাধান নয়। এখন দরকার আস্থা ফেরানো, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা পরিষ্কার করা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি তদারকি যদি কার্যকর হয়, তাহলে আমানতকারীরা স্বস্তি পাবেন। আর যদি মূল সমস্যাগুলো অমীমাংসিত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে আবারও চাপ তৈরি হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত