দিল্লি ইমিগ্রেশন থেকে ফিরলেন তথ্য উপদেষ্টা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬
  • ৪ বার

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের নয়াদিল্লিতে ইন্ডিয়ান ওশেন রিম অ্যাসোসিয়েশন বা আইওআরএর বৈঠকে যোগ দিতে গিয়ে দিল্লি বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন জটিলতার মুখে পড়েন প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। ঘটনাটিকে অসৌজন্যমূলক আচরণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এর প্রতিবাদে তিনি সম্মেলনে অংশ না নিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন।

সোমবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তিনি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। নয়াদিল্লি থেকে সরাসরি না এসে তিনি কলম্বো হয়ে ঢাকায় ফেরেন। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তিনি ভিআইপি গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যান। এ সময় গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত থাকলেও তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি।

জাহেদ উর রহমান রোববার ঢাকা থেকে দিল্লির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। সোমবার থেকে নয়াদিল্লিতে শুরু হওয়া আইওআরএর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দুই দিনের বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল তার। এই সফর ছিল সরকারি পর্যায়ের। কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন আগেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সফরসূচি সম্পর্কে জানিয়েছিল।

তবু দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তার প্রবেশ প্রক্রিয়া আটকে দেয় বলে জানা গেছে। কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়মিত যাচাইয়ের সময় তার নাম ফ্ল্যাগ করা হয়। এরপর তাকে অতিরিক্ত যাচাই-বাছাইয়ের জন্য অপেক্ষায় রাখা হয়। পরে সংশ্লিষ্টদের হস্তক্ষেপে তাকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে ততক্ষণে পরিস্থিতি নিয়ে তিনি ক্ষুব্ধ হন এবং সফর চালিয়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এই ঘটনাকে শুধু একটি বিমানবন্দর জটিলতা হিসেবে দেখছে না কূটনৈতিক মহল। কারণ তিনি কোনো ব্যক্তিগত সফরে যাননি। তিনি একটি আঞ্চলিক সম্মেলনে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিতে যাচ্ছিলেন। তাই বিমানবন্দরে তাকে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা বা অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হলে তা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের প্রশ্ন তোলে। বিশেষ করে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক যখন নানা ইস্যুতে সংবেদনশীল, তখন এমন ঘটনা আরও বেশি গুরুত্ব পায়।

আইওআরএ ভারত মহাসাগর ঘিরে থাকা দেশগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ফোরাম। বাণিজ্য, সমুদ্র নিরাপত্তা, নীল অর্থনীতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং সমুদ্রভিত্তিক উন্নয়ন নিয়ে এই ফোরামে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ এই অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বন্দর, জ্বালানি, সামুদ্রিক সম্পদ এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। তাই আইওআরএর বৈঠকে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

এই বৈঠকে জাহেদ উর রহমানের অংশ নেওয়ার কথা ছিল এমন সময়ে, যখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। সীমান্ত, বাণিজ্য, ভিসা, পানি, নিরাপত্তা, সংখ্যালঘু ইস্যু এবং আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে। সম্পর্ক উন্নয়নের কথাও দুই পক্ষ বলছে। এমন প্রেক্ষাপটে দিল্লি বিমানবন্দরের ঘটনা অস্বস্তি তৈরি করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, একজন সরকারি উপদেষ্টার সফরসূচি আগে থেকে জানানো থাকলে বিমানবন্দরে তার প্রোটোকল ও ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া আরও সংবেদনশীলভাবে সামলানো উচিত ছিল। কোনো প্রশাসনিক বিভ্রান্তি থাকলেও তা দ্রুত সমাধান করা যেত। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষা, অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বা অসৌজন্যমূলক আচরণ হলে তা প্রতিনিধিদলের মর্যাদার সঙ্গে যায় না। সেই কারণেই জাহেদ উর রহমান সম্মেলন বর্জন করে ফিরে আসেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এই ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক পূর্ণ বিবৃতি পাওয়া যায়নি। ফলে ঘটনার সব দিক এখনো পরিষ্কার নয়। ঠিক কত সময় তাকে অপেক্ষায় রাখা হয়েছিল, ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ কী ধরনের প্রশ্ন তুলেছিল, এবং পরে কোন পর্যায়ে অনুমতি দেওয়া হয়, এসব বিষয়ে আরও সরকারি তথ্য প্রয়োজন।

এই ধরনের ঘটনায় কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া সাধারণত ধাপে ধাপে আসে। প্রথমে সংশ্লিষ্ট মিশন বা হাইকমিশন তথ্য সংগ্রহ করে। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে বিষয়টি তোলা হতে পারে। যদি সরকার মনে করে কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভঙ্গ হয়েছে, তাহলে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানোও হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জাহেদ উর রহমান নিজেই সম্মেলনে না গিয়ে দেশে ফেরাকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

ঘটনাটি সাধারণ মানুষের মধ্যেও আলোচনা তৈরি করেছে। কারণ বাংলাদেশি নাগরিকদের ভারতের ইমিগ্রেশন ও ভিসা সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে আগে থেকেই নানা অভিযোগ আছে। কেউ ভিসা বিলম্বের কথা বলেন। কেউ বিমানবন্দরে অতিরিক্ত প্রশ্নের কথা বলেন। আবার কেউ সীমান্তে হয়রানির অভিযোগ করেন। সরকারি উচ্চপর্যায়ের একজন প্রতিনিধি এমন পরিস্থিতির মুখে পড়লে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়ে।

তবে এটিও মনে রাখা দরকার, প্রতিটি দেশের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ নিজস্ব আইন অনুযায়ী যাত্রী যাচাই করতে পারে। নিরাপত্তা, নথি, ভিসা, সফরের উদ্দেশ্য বা তথ্যের মিল না থাকলে তারা প্রশ্ন করতে পারে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় কূটনৈতিক সৌজন্য, পেশাদার আচরণ এবং সরকারি সফরের মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি। বিশেষ করে যখন সফরটি একটি আঞ্চলিক সম্মেলনের অংশ, তখন এই দায়িত্ব আরও বেশি।

জাহেদ উর রহমান বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বলায় তার ব্যক্তিগত বক্তব্য জানা যায়নি। তবে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত থেকেই বোঝা যায়, তিনি ঘটনাটিকে গুরুতরভাবে নিয়েছেন। সরকারের ভেতরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে ভারতীয় পক্ষের ব্যাখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বহুস্তরীয়। দুই দেশের মধ্যে ইতিহাস, সীমান্ত, বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও মানুষের যোগাযোগ গভীর। কিন্তু ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যেও মর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মান খুব গুরুত্বপূর্ণ। কূটনীতিতে বড় চুক্তির পাশাপাশি ছোট আচরণও বড় বার্তা দেয়। বিমানবন্দর, সীমান্ত, ভিসা কাউন্টার বা আনুষ্ঠানিক বৈঠকের আচরণ অনেক সময় সম্পর্কের বাস্তব মানসিকতা তুলে ধরে।

এই ঘটনার পর কূটনৈতিক মহলের নজর এখন দুই দেশের পরবর্তী পদক্ষেপে। বাংলাদেশ কি আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি ভারতের কাছে তুলবে, ভারত কি ব্যাখ্যা দেবে, এবং ভবিষ্যতে সরকারি প্রতিনিধিদের সফরে এমন পরিস্থিতি এড়াতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।

সব মিলিয়ে দিল্লি বিমানবন্দরে জাহেদ উর রহমানের ইমিগ্রেশন জটিলতা শুধু একটি ব্যক্তিগত অসুবিধার ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের সরকারি প্রতিনিধির মর্যাদা, ভারতীয় ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার আচরণ এবং দুই দেশের সম্পর্কের সংবেদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। এখন প্রয়োজন শান্ত, স্পষ্ট ও কূটনৈতিকভাবে দায়িত্বশীল সমাধান। কারণ প্রতিবেশী সম্পর্ক টেকসই করতে হলে শুধু বৈঠক নয়, আচরণেও সম্মান দেখাতে হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত