প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া বর্তমান সরকারের কৃতিত্ব নয়, বরং আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের কৃতিত্ব বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, বেনজীরের বিরুদ্ধে রেড অ্যালার্টও বর্তমান সরকার জারি করেনি। তবে তার আটক হওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্জন।
রোববার রাতে সিলেট সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার, দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া, সরকারের সদিচ্ছা এবং দুর্নীতির বিচার নিয়ে কথা বলেন। তার বক্তব্যে একদিকে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। অন্যদিকে তিনি ঘটনাটিকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবেও দেখেছেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ের কারাগারেই থাকবেন, নাকি তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে, তা সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। তার মতে, একজন আলোচিত সাবেক পুলিশপ্রধানকে বিদেশে গ্রেপ্তার করা বড় ঘটনা। কিন্তু এখানেই বিষয়টি শেষ নয়। এখন মূল প্রশ্ন হলো, তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনগত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা হবে কি না।
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের খবর ১৪ জুন প্রকাশ্যে আসে। সরকারি সূত্র ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলার ভিত্তিতে ইন্টারপোলের রেড নোটিশের পর তাকে ১২ জুন দুবাই পুলিশ গ্রেপ্তার করে। বাংলাদেশ পুলিশও আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তারের তথ্য পেয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এনসিবি আবুধাবি থেকে এনসিবি ঢাকাকে এ বিষয়ে জানানো হয়।
বেনজীর আহমেদ একসময় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের অন্যতম প্রভাবশালী কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশের মহাপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্বে ছিলেন। তাই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা এবং বিদেশে গ্রেপ্তারের ঘটনা দেশের রাজনীতি ও প্রশাসনে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী এবং দুই মেয়ের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা করে। মামলায় জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে মোট ৭৪ কোটি ১৩ লাখ ৩৯ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সেই সম্পদের তথ্য গোপনের বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির আদেশ দেন। পরে এনসিবি ঢাকা ইন্টারপোলের কাছে রেড নোটিশ জারির অনুরোধ পাঠায়। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে বলে পুলিশ সদর দপ্তর নিশ্চিত করে।
ইন্টারপোলের রেড নোটিশ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক সময় ভুল ধারণা থাকে। রেড নোটিশ কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়। এটি ইন্টারপোলের সদস্য দেশগুলোর কাছে একজন পলাতক ব্যক্তিকে শনাক্ত, অবস্থান নির্ধারণ এবং সাময়িকভাবে আটক করার অনুরোধ। সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী সেই ব্যক্তি আটক হলে পরবর্তী ধাপে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। তাই বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের পরও তাকে সরাসরি বাংলাদেশে পাঠানো হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইনি প্রক্রিয়া এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
জামায়াত আমিরের বক্তব্যের মূল জায়গাটিও এখানেই। তিনি সরকারের কৃতিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার দাবি, বেনজীরকে আটক করা সরকারের সরাসরি অর্জন নয়, বরং ইন্টারপোলের ভূমিকার ফল। তবে তিনি এটিও বলেছেন, তাকে দেশে ফেরানো এখন সরকারের ইচ্ছা ও উদ্যোগের ওপর নির্ভর করছে। অর্থাৎ গ্রেপ্তারের পরবর্তী ধাপেই সরকারের আসল পরীক্ষা শুরু হচ্ছে।
এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ শুধু একটি ব্যক্তিগত মামলা নয়। এটি সাবেক ক্ষমতাকাঠামো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় পদে থাকা ব্যক্তিদের সম্পদের উৎস নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। সাধারণ মানুষ জানতে চায়, ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও আইন একইভাবে কাজ করবে কি না।
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর থেকেই তার সম্পদ, পরিবারের নামে জমি, ফ্ল্যাট, কোম্পানি ও ব্যাংক হিসাব নিয়ে সংবাদমাধ্যমে নানা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। পরে দুদক আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করে। অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা হয়। এরপর আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও রেড নোটিশের প্রক্রিয়ায় যায়। এই ধারাবাহিকতায় দুবাইয়ে তার গ্রেপ্তার বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
তবে অভিযোগ থাকা আর দোষী সাব্যস্ত হওয়া এক বিষয় নয়। বেনজীর আহমেদ এখনো আদালতে দোষী প্রমাণিত হননি। তার বিরুদ্ধে মামলা আছে, রেড নোটিশের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার প্রশ্ন সামনে এসেছে। কিন্তু আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত তিনি আইনের দৃষ্টিতে অভিযুক্ত, দোষী নন। তাই পুরো বিষয়টি বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এগোতে হবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে কাউকে ফিরিয়ে আনা সহজ প্রক্রিয়া নয়। বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন করতে হবে। অভিযোগের নথি, মামলার বিবরণ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, প্রযোজ্য আইন, সম্ভাব্য সাজা এবং তদন্ত প্রতিবেদন নির্দিষ্ট নিয়মে জমা দিতে হবে। এসব নথি আরবি ভাষায় অনুবাদ করতে হতে পারে। কূটনৈতিক চ্যানেলও ব্যবহার করতে হবে। আমিরাতের আদালত এসব নথি দেখে সিদ্ধান্ত নেবে।
এখানেই সরকারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশ করলেই হবে না। দ্রুত, সঠিক ও আইনসম্মতভাবে প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠাতে হবে। নথিতে কোনো ঘাটতি থাকলে আসামিপক্ষ আদালতে আপত্তি তুলতে পারে। প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে। তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর, দুদক এবং এনসিবি ঢাকার মধ্যে সমন্বয় জরুরি।
জামায়াত আমিরের বক্তব্যে এই চাপই প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, বেনজীর দুবাইয়ে থাকবেন, নাকি দেশে ফিরবেন, সেটি সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। তার এই মন্তব্যে রাজনৈতিক সমালোচনা থাকলেও একটি বাস্তব প্রশ্ন আছে। বিদেশে গ্রেপ্তার হওয়া কোনো আলোচিত আসামিকে দেশে ফেরাতে রাষ্ট্র কত দ্রুত এবং কত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
অতীতে বিদেশে থাকা অনেক আলোচিত আসামিকে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে বাংলাদেশ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কখনো প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকা, কখনো নথিপত্রের ঘাটতি, কখনো বিদেশি আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়া, কখনো রাজনৈতিক আশ্রয়ের দাবি, এসব কারণে প্রক্রিয়া জটিল হয়েছে। বেনজীর আহমেদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জ আসতে পারে।
এদিকে এই গ্রেপ্তার সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের প্রত্যাশা তৈরি করেছে। দুর্নীতির অভিযোগে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিচার হবে কি না, সেই প্রশ্ন দীর্ঘদিনের। ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে মানুষের আস্থা বাড়ে। তবে সেই ব্যবস্থা যদি শুধু আলোচনার পর্যায়ে থাকে, আর আদালতে শেষ পর্যন্ত টেকে না, তাহলে হতাশা তৈরি হয়। তাই প্রমাণভিত্তিক মামলা, সঠিক তদন্ত এবং ন্যায়বিচারই এখন সবচেয়ে জরুরি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার নিয়ে বিভিন্ন দলের প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক। কারণ তিনি ছিলেন সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার একজন শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। সরকার এই ঘটনাকে আইনি সাফল্য হিসেবে দেখাতে চাইতে পারে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো বলছে, এটি সরকারের নয়, বরং আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার ফল। এই বিতর্ক আগামী দিনেও চলবে।
তবে রাজনৈতিক কৃতিত্বের বিতর্কের বাইরে একটি বিষয় স্পষ্ট। একজন সাবেক আইজিপির বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি বিদেশে আটক হয়েছেন। এখন বাংলাদেশ তাকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ পেয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগানো গেলে তা দুর্নীতি দমন ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে বড় নজির হতে পারে।
ডা. শফিকুর রহমানের মন্তব্য তাই রাজনৈতিক হলেও জনস্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। বেনজীরকে গ্রেপ্তার করা হলো, কিন্তু তাকে কি দেশে এনে বিচার করা যাবে? মামলার নথি কি আন্তর্জাতিক আদালতের মানদণ্ডে টিকবে? সরকার কি দ্রুত প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠাবে? আর বিচার কি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রমাণনির্ভর হবে?
সব মিলিয়ে বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার নিয়ে জামায়াত আমিরের বক্তব্য দেশের চলমান রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তিনি সরকারের কৃতিত্ব অস্বীকার করলেও ঘটনাটিকে বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন বলেছেন। এখন সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো প্রত্যর্পণ। গ্রেপ্তার আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ফল হতে পারে। কিন্তু তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের মুখোমুখি করা সরকারের দক্ষতা, সদিচ্ছা ও আইনি প্রস্তুতির ওপরই নির্ভর করবে।