অনিয়ম তদন্তের মধ্যেই ট্রাম্পের শ্রমমন্ত্রী পদত্যাগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১২ বার
অনিয়ম তদন্তের মধ্যেই ট্রাম্পের শ্রমমন্ত্রী পদত্যাগ

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের শ্রমমন্ত্রী লরি চাভেজ ডেরেমার পদত্যাগ করেছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়ম ও নৈতিকতা লঙ্ঘনের অভিযোগের তদন্ত চলমান থাকা অবস্থাতেই এই পদত্যাগকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার সরকারি সূত্রে তার পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিনি বেসরকারি খাতে নতুন কর্মসংস্থানে যাচ্ছেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের মুখপাত্র স্টিভেন চিউং বলেন, লরি চাভেজ ডেরেমার দায়িত্ব পালনকালে শ্রমিকদের সুরক্ষা ও ন্যায্য শ্রমনীতি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি নিশ্চিত করেন যে, প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি এখন আর মন্ত্রিসভায় থাকছেন না।

চাভেজ ডেরেমার পদত্যাগ এমন এক সময় এলো, যখন তার বিরুদ্ধে শ্রম দপ্তরের অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলছিল। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে অধস্তন কর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক, কর্মস্থলে মদ্যপান এবং সরকারি সুবিধা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা। মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব অভিযোগের তদন্ত করছে শ্রম মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শক সংস্থা, যা ইতোমধ্যে কয়েকজন কর্মকর্তার চাকরি হারানোর কারণ হয়েছে।

মার্চ মাসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে The New York Times জানায়, চাভেজ ডেরেমারের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা কর্মীর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সরকারি অফিসে মদের উপস্থিতি এবং সরকারি অর্থে ব্যক্তিগত ভ্রমণের ব্যবহার। এছাড়া রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সুবিধা দিতে অনুদান ব্যবহারের অভিযোগও উঠে এসেছে।

তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, তিনি ও তার ঘনিষ্ঠরা তরুণ কর্মীদের কাছে ব্যক্তিগত বার্তা পাঠিয়ে অস্বাভাবিক যোগাযোগ বজায় রাখতেন। এসব অভিযোগের পাশাপাশি তার স্বামী শন ডেরেমারের বিরুদ্ধেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অন্তত দুই নারী কর্মী অভিযোগ করেন, তিনি তাদের সঙ্গে অনুচিত আচরণ করেছেন। অভিযোগের পর তাকে মন্ত্রণালয়ের ভবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

তবে তার স্বামীর আইনজীবীরা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং দাবি করেছেন, এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তদন্তকারী সংস্থাগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ফৌজদারি মামলা দায়ের করেনি। তবুও শ্রম দপ্তরের তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে।

এই ঘটনায় রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের সিনেটর জন কেনেডি বলেন, পদত্যাগ করাই ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত। তার মতে, প্রশাসনের ভাবমূর্তি রক্ষায় এটি একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।

লরি চাভেজ ডেরেমার এর আগে ওরেগন অঙ্গরাজ্য থেকে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি শ্রমিক পরিবারের সন্তান এবং তার মা ছিলেন শ্রমিক ইউনিয়ন ইন্টারন্যাশনাল ব্রাদারহুড অব টিমস্টার্স-এর সদস্য। শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে প্রথমে শ্রমমন্ত্রী হিসেবে তার মনোনয়নকে অনেকেই ইতিবাচকভাবে দেখেছিলেন।

২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনে শ্রমনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর একটি অংশ তাকে সমর্থন জানিয়েছিল। পরবর্তীতে মার্কিন সিনেটে তিনি ৬৭–৩২ ভোটে অনুমোদিত হন, যেখানে কিছু ডেমোক্র্যাটও তার পক্ষে ভোট দেন।

পদত্যাগের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, দায়িত্ব পালনকালে তিনি শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করেছেন। তিনি আরও বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানো, ভালো চাকরির সুযোগ তৈরি, ওষুধের দাম কমানো এবং অবসরকালীন নিরাপত্তা শক্তিশালী করার মতো উদ্যোগ তিনি নিয়েছেন।

তবে তার মেয়াদকালে বিতর্কিত সিদ্ধান্তও ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি করে। শ্রম দপ্তরের একটি আন্তর্জাতিক কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশুশ্রম ও দাস শ্রম বন্ধে যে অনুদান দেওয়া হতো, তার একটি বড় অংশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই কর্মসূচির মাধ্যমে গত দুই দশকে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭ কোটি ৮০ লাখ শিশুশ্রম কমাতে সহায়তা করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

এছাড়া তার সময়কালে ৬০টিরও বেশি শ্রমনিরাপত্তা বিধি পরিবর্তন বা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল গৃহকর্মী ও প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি সুরক্ষা, রাসায়নিক নিরাপত্তা, খনি শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং কৃষি শ্রমিক পরিবহনের নিরাপত্তা বিধি শিথিল করার প্রস্তাব। এসব পরিবর্তনের বিরুদ্ধে শ্রমিক সংগঠন ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান।

ট্রাম্প প্রশাসনের মুখপাত্র জানিয়েছেন, লরির পদত্যাগের পর ভারপ্রাপ্ত শ্রমমন্ত্রী হিসেবে কিথ সন্ডারলিং দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

লরি চাভেজ ডেরেমারের পদত্যাগকে কেন্দ্র করে এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে শ্রমনীতি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং নৈতিকতার প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ নয়, বরং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক চাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত