পারিবারিক কলহে ঘুমন্ত বাবাকে কুপিয়ে হত্যা করল ছেলে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩১ বার
পারিবারিক কলহে ঘুমন্ত বাবাকে কুপিয়ে হত্যা করল ছেলে

প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় রোববার (৯ নভেম্বর) রাত সাড়ে ১২টার দিকে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। পারিবারিক কলহের জেরে মতি মিয়া (৬৫) নামে এক অভিজ্ঞ ও অভিভাবক স্বভাবের বাবা তার নিজ ছেলে ফারুক মিয়ার (২৭) হাতে খুন হন। ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ফারুক মিয়াকে গ্রেফতার করেছে এবং লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে।

স্থানীয়রা জানায়, বাঁশকান্দি ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের পঞ্চগ্রাম এলাকায় এই ট্র্যাজেডি ঘটেছে। মতি মিয়া ও তার ছেলে ফারুক মিয়া শিবচরে শ্রমিকের কাজ করতেন। তাদের মূল বাড়ি চাপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভোলার হাট থানার বড়োহাটি এলাকায়। স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরে বাবা ও ছেলের মধ্যে পারিবারিক বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য চলছিল বলে জানিয়েছে। এই মনোমালিন্য কখনো কখনো কথাকাটাকাটিওর পর্যায়ে পৌঁছেছে।

পরিবার সূত্র জানায়, ফারুক মিয়া তার বাবাকে প্রায়ই আচরণগত কারণে ভয় পেত। তিনি বাবার সঙ্গে একাধিকবার তর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন। তবে এ ঘটনা পর্যন্ত কেউ ধারণাও করেনি যে, পারিবারিক কলহ এতটা ভয়াবহ রূপ নেবে। ঘটনার দিন বিকাল থেকেই ফারুক পরিকল্পনা শুরু করেন বলে পুলিশকে স্বীকার করেছেন। রাতের অন্ধকারে, যখন মতি মিয়া ঘুমিয়ে পড়েন, ফারুক হাতে কোদাল নিয়ে তার বাবার ঘরে প্রবেশ করে। কয়েক মিনিটের মধ্যে তিনি এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন, যার ফলে মতি মিয়া ঘটনাস্থলেই মৃত্যু বরণ করেন।

স্থানীয়রা বলেন, মতি মিয়া ছিলেন শান্ত স্বভাবের, অল্পবয়সে সংসারের দায়িত্ব নেওয়া একজন অভিভাবক। গ্রামের মানুষ তার সহজ সরল জীবন ও সহানুভূতিশীল চরিত্রের জন্য তাকে ভালোবাসতেন। অপরদিকে ফারুক মিয়া মায়ের মৃত্যুর পর থেকে বাবার সঙ্গে একাধিক বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য তৈরি হয়েছিল। ঘটনার রাতে তার ঘুমন্ত বাবার উপর হামলা চালানোকে স্থানীয়রা বিশ্বাস করতে পারছিল না।

শিবচর থানার ওসি রাকিবুল ইসলাম বলেন, “পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করেছে এবং ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। হত্যার সঙ্গে জড়িত ফারুক মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমরা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি।”

এ ঘটনায় এলাকার মানুষ গভীর শোকাহত। পঞ্চগ্রামের সাধারণ মানুষ মনে করছেন, পারিবারিক কলহ কিভাবে এমন একটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে পরিণত হলো, তা ভাবতে গিয়ে তারা হতবাক। তারা বলেন, “মতি মিয়া খুব শান্ত ও নম্র মানুষ ছিলেন। আমাদের গ্রামের মানুষ তার মৃত্যুর খবরে ধাক্কা খেয়েছে। কখনও ভাবিনি, একজন ছেলে নিজের বাবাকে এমন নির্মমভাবে হত্যা করতে পারে।”

স্থানীয় সমাজকর্মী ও পঞ্চগ্রামের প্রবীণরা বলছেন, “এ ধরনের ঘটনা আমাদের সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। পারিবারিক কলহ ও মানসিক চাপকে উপেক্ষা করলে কখনো কখনো এ ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। আমাদের তরুণদের মানসিক প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার প্রয়োজন।”

ফারুক মিয়ার মনের অবস্থা নিয়ে স্থানীয়রা নানা রকম আলোচনা করছেন। কিছুজন মনে করছেন, দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ, চাপ ও মানসিক উত্তেজনা তার আচরণে প্রভাব ফেলেছিল। তবে কেউ কেউ বলছেন, এটি শুধুই পরিকল্পিত হত্যা এবং তার জন্য তাকে অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত।

শিবচর থানার পুলিশ জানিয়েছে, ফারুক মিয়ার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তার পরিবার এবং স্থানীয় জনগণ এখনো শোকে বিভোর। এলাকার স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষকরা বলছেন, এই ঘটনার প্রভাব শিশুর উপরও পড়তে পারে। গ্রামে দীর্ঘদিন শান্তি বিরাজ করলেও এখন কেউই আতঙ্কমুক্ত নয়।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ঘটনার পর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা অত্যন্ত বিচলিত এবং আতঙ্কিত। মতি মিয়ার মৃত্যুর পর পরিবারের বড়রা এখন আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ফারুকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা আশা করছেন, আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ন্যায়বিচার কার্যকর হবে।

এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশের গ্রামীণ ও অগ্রসর এলাকার জন্য গভীর সামাজিক বার্তা বহন করছে। পারিবারিক কলহ ও মানসিক উত্তেজনা কখনো কখনো ভয়াবহ পরিণতির দিকে ধাবিত করতে পারে। সমাজকর্মীরা বারবার শিক্ষা দিয়েছেন, পারিবারিক সমস্যা সমাধানে সংলাপ, মনন এবং শান্তিপূর্ণ উপায় অবলম্বন করাই সবচেয়ে জরুরি।

মতি মিয়ার মৃত্যুতে পুরো গ্রাম শোকাহত হলেও তারা আশা রাখছেন, ফারুক মিয়া আইনের কঠোর প্রয়োগের মুখোমুখি হবেন। পঞ্চগ্রামের এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “আজকের এই মৃত্যু আমাদের সবাইকে সচেতন করেছে। আমরা চাই যেন ভবিষ্যতে কেউ এমন ভয়াবহ অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে। পারিবারিক শান্তি ও সামাজিক মূল্যবোধ বজায় রাখা আমাদের কর্তব্য।”

ঘটনার প্রেক্ষিতে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ সতর্ক বার্তা দিয়েছেন, কেউই ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বকে হত্যা বা সহিংসতায় রূপান্তরিত করতে পারবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানাচ্ছে, ঘটনার তদন্তের জন্য আরও স্বতন্ত্র দল পাঠানো হয়েছে এবং মামলার সব দিক বিশ্লেষণ করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সব মিলিয়ে, শিবচরের পঞ্চগ্রাম এলাকার এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড পারিবারিক কলহ ও মানসিক উত্তেজনার সামাজিক প্রভাবের এক ন্যক্কারজনক উদাহরণ হয়ে রইল। এলাকাবাসী শোকাহত হলেও আশা করছেন, আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে এবং এমন ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আর কেউ ঘটাতে সাহস পাবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত