সিলেটে টাইগারদের দাপট, ইনিংস ব্যবধানে আইরিশদের আত্মসমর্পণ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২১ বার
সিলেটে টাইগারদের দাপট, ইনিংস ব্যবধানে আইরিশদের আত্মসমর্পণ

প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫ শুক্রবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে চার দিনেরও কম সময়ে শেষ হয়ে গেল বাংলাদেশ ও আয়ারল্যান্ডের মধ্যকার একমাত্র টেস্ট ম্যাচ। প্রথম দিন থেকেই প্রভাব বিস্তার করেছিল স্বাগতিক টাইগাররা, আর শেষ পর্যন্ত এক ইনিংস ও ৪৭ রানের বিশাল ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে ম্যাচ নিয়েই নিলো পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। ব্যাটে-বলে সেরা পারফরম্যান্সে এগিয়ে ছিল নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বাধীন দল। আয়ারল্যান্ডের ব্যাটারদের মাঝে কিছুটা লড়াই দেখা গেলেও তা বাংলাদেশকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো কোনো অবস্থায় পৌঁছাতে পারেনি। পুরো ম্যাচজুড়ে ছিল একতরফা আধিপত্য, আর সেই আধিপত্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই ম্যাচসেরা হন বাংলাদেশের তরুণ ওপেনার মাহমুদুল হাসান জয়—তার দৃষ্টিনন্দন ১৭১ রানের ইনিংস ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণে রাখে মুখ্য ভূমিকা।

ম্যাচের শুরু থেকেই আয়ারল্যান্ড ব্যাটিং অর্ডারের বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করে। প্রথম ইনিংসে তারা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয় মাত্র ২৮৬ রান, যেখানে বাংলাদেশের বোলাররা শৃঙ্খলাপূর্ণ বোলিংয়ে প্রতিপক্ষকে একাধিকবার চাপে ফেলে রাখেন। মেহেদী হাসান মিরাজ আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়ে নেন ৩ উইকেট, আর হাসান মুরাদ, তাইজুল ইসলাম ও হাসান মাহমুদ প্রত্যেকে নেন ২টি করে উইকেট। তবে আয়ারল্যান্ডের প্রথম ইনিংসটির মূল গল্প ছিল বাংলাদেশ বোলারদের ধৈর্য, ধারাবাহিকতা এবং প্রতিটি স্পেলে ব্যাটারদের ওপর চাপ ধরে রাখার সক্ষমতা।

জবাবে বাংলাদেশ নিজেদের প্রথম ইনিংসে ব্যাট হাতে অবিশ্বাস্য আধিপত্য দেখায়। ইনিংস ঘোষণা করার আগে দলীয় স্কোর থামে ৫৮৭ রানে। বাংলাদেশের টপ ও মিডল অর্ডার ছিলেন অসাধারণ ব্যস্ততায়। মাহমুদুল হাসান জয়ের ১৭১ রানের পরিপাটি ইনিংসটি ছিল টেস্ট ক্রিকেটে পরিণতি ও শুদ্ধতার এক দৃষ্টান্ত। তার সঙ্গে সাদমান ইসলামের ৮০, মুমিনুল হকের ৮২, নাজমুল হোসেন শান্তর সেঞ্চুরি এবং লিটন দাসের ঝলমলে ৬০ রানের ইনিংস গড়ে তোলে রানের পাহাড়। তাদের প্রতিটি শট, প্রতিটি পার্টনারশিপ দেখিয়েছিল কীভাবে ধৈর্য ও দক্ষতা মিলিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে বড় স্কোর গড়া যায়। আইরিশ বোলাররা লাইন-লেন্থ ধরে রাখতে বারবার ব্যর্থ হয়েছেন, তার সুযোগ নিয়ে ব্যাটাররা নিজেদের ইনিংসগুলো করেছেন আরও অর্থবহ।

বাংলাদেশের বিশাল লিডের চাপে পড়ে দ্বিতীয় ইনিংসে শুরুতেই ভেঙে পড়ে আয়ারল্যান্ড। তৃতীয় দিনের শেষে তারা ছিল ৮৬ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে একেবারে প্রতিরোধহীন। চতুর্থ দিনের সকালে ব্যাট হাতে চেষ্টা ছিল, তবে বাংলাদেশের স্পিন ত্রয়ীর ঘূর্ণিতে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। ম্যাকব্রাইন একক প্রতিরোধ গড়ে ফিফটি তুলে নিয়ে দলকে কাঁধে তোলার চেষ্টা করেন। ১০৬ বলে তার ৫২ রানের ইনিংসটি ছিল নিখুঁত টেস্ট ব্যাটিংয়ের পরিচয়। কিন্তু সঙ্গী না পাওয়ায় সেই ইনিংস দলের জন্য যথেষ্ট হয়ে ওঠেনি।

তার সঙ্গে ম্যাথিউ হামফ্রেস কিছুটা সময় লড়লেও তাইজুল ইসলামের নিখুঁত শট নির্বাচনে তাকে শেষ পর্যন্ত ফিরে যেতে হয়। এরপর অধিনায়ক অ্যান্ড্রু বালবার্নিকে নিয়ে ৬৬ রানের একটি জুটি গড়েন ম্যাকব্রাইন, যা ছিল আয়ারল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংসের সবচেয়ে বড় জুটি। কিন্তু হাসান মুরাদ তার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বালবার্নিকে বিদায় করলে আবারও ধস নামে অতিথিদের ইনিংসে।

লাঞ্চ বিরতির আগেই ম্যাকব্রাইন তার ফিফটি সম্পন্ন করেন, কিন্তু বিরতির পর আর বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। নাহিদ রানা তার ইনিংসের ইতি টানলে আয়ারল্যান্ড আবারও গভীর সংকটে পড়ে। এরপর ব্যারি ম্যাকার্থি ও জন নেইল নবম উইকেটে ৫৪ রানের জুটি গড়ে ইনিংস হার এড়ানোর চেষ্টা করেন। তাদের দৃঢ়তা কিছুটা সময় ম্যাচটিকে লম্বা করলেও শেষপর্যন্ত হাসান মুরাদ ও তাইজুলের ঘূর্ণি সামনে টিকতে পারেননি কোনো ব্যাটার। নেইল আউট হওয়ার পর ম্যাকার্থি শেষ চেষ্টা করেও তাইজুলের ঘুর্নিতে বিদায় নিলে বাংলাদেশ নিশ্চিত করে ইনিংস ও ৪৭ রানের জয়।

পুরো ম্যাচজুড়ে স্পিনারদের শাসন ছিল স্পষ্ট। হাসান মুরাদ দ্বিতীয় ইনিংসে নিয়েছেন ৪ উইকেট, তাইজুলের ঝুলিতে ৩টি এবং নাহিদ রানার হাতে গেছে ২ উইকেট। তাদের নিখুঁত ঘূর্ণি আয়ারল্যান্ডের ব্যাটারদের বারবার বিভ্রান্ত করেছে, আর সুযোগ পেলেই দলের জন্য উইকেট এনে দিয়েছে।

এই জয়ের মাধ্যমে শুধু সিরিজের জয়ই নয়, টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের দাপট আরও একবার তুলে ধরলো বাংলাদেশ। ব্যাটিং, বোলিং—দুই বিভাগেই নিখুঁত পারফরম্যান্স টাইগারদের সামনে এগিয়ে নিয়েছে আত্মবিশ্বাসের নতুন উচ্চতায়। বিশেষ করে টপ অর্ডারের ধারাবাহিকতা ও বোলারদের শৃঙ্খলাপূর্ণ বোলিং ভবিষ্যতের টেস্ট খেলায়ও দলের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

সিলেট টেস্টটি তাই শুধু বড় ব্যবধানে জয়ের গল্প নয়, এটি ছিল বাংলাদেশ দলের টেস্ট ক্রিকেটে পরিণত চিন্তাভাবনা, ধারাবাহিকতা এবং আত্মবিশ্বাসের গল্প। মাঠে নামা একাদশের প্রতিটি সদস্য তাদের ভূমিকা সফলভাবে পালন করেছেন। ম্যাচ শেষে টাইগারদের গর্ব নিয়ে মাঠ ছাড়ার জন্য যথেষ্ট কারণ ছিল। আর দর্শকদের কাছে এটি ছিল টেস্ট ক্রিকেটের আনন্দকে নতুন করে আবিষ্কার করার মতো এক অভিজ্ঞতা—যেখানে ব্যাটে-বলে টাইগারদের আধিপত্য ছিল স্পষ্ট, আর জয় ছিল অবধারিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত