প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। নির্বাচনটি দেশ-বিদেশে ‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিত হয় মূলত ভোটের আগের রাতে ফল নির্ধারণ, বিপুল অনিয়ম, ভোটকেন্দ্র দখল, বিরোধী প্রার্থীদের এজেন্ট বের করে দেওয়া এবং নির্বাচনী প্রশাসনের ব্যাপক অপব্যবহারের অভিযোগের কারণে। কিন্তু সেই নির্বাচন পরিচালনার পেছনে কত বড় আর্থিক তহবিল ব্যবহৃত হয়েছিল এবং কীভাবে টাকা হাতবদল হয়েছে—তথ্যপ্রবাহে এসব দীর্ঘদিন আবছা ছিল। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে অবশেষে বেরিয়ে এসেছে চমকে দেওয়ার মতো কিছু বাস্তবতা, যা শুধু রাজনৈতিক অনাচারের নয়, রাষ্ট্রযন্ত্রকে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো ভয়াবহ দুর্নীতির নগ্ন চিত্রও সামনে তুলে ধরেছে।
নির্বাচনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, যাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ, গঠন করেছিল আট হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল। এই তহবিল সংগ্রহ করা হয় দেশের কয়েকটি শীর্ষ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক এবং টেন্ডারবাণিজ্যের মাধ্যমে। একদিকে চাঁদাবাজি ও চাপ সৃষ্টি করে নেওয়া হয় বিপুল অঙ্কের অর্থ, অন্যদিকে ব্যাংকগুলো থেকে ভুয়া ঋণ আদায় করে তৈরি করা হয় নির্বাচনী অনুশাসনের এক ভয়ঙ্কর অর্থনৈতিক কাঠামো। তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের দাবি, পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত, যেখানে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এক অদৃশ্য নেটওয়ার্ক—যারা ভোট ডাকাতির পুরো সমীকরণ নিয়ন্ত্রণ করতেন।
এই বিশাল তহবিল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানা, প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, রাজনৈতিকবিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম এবং এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম মাসুদের হাতে। পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, যিনি পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক, নিশ্চিত করেছেন যে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি এসব চারজনের কাছে ব্যক্তিগতভাবে চলে যায়। বাকি অর্থ ব্যবহৃত হয় প্রশাসন, পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সরকারি বিভিন্ন ইউনিটকে ‘আগাম প্রণোদনা’ হিসেবে দেওয়ার ক্ষেত্রে।
এই অর্থের বড় অংশ বিতরণ করা হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে। তদন্তকারীদের ভাষ্যে, নির্বাচনকে কাঙ্ক্ষিত চেহারা দিতে যেসব কর্মকর্তা মাঠে তৎপর ছিলেন, তাদের বড় অংশই আগে থেকেই ‘পুরস্কার’ হিসেবে মোটা অঙ্কের টাকা পেয়ে যান। অনেকে নেন নগদ ক্যাশ, কেউ কেউ নেন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে। পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয় রাজধানীর গোপন বৈঠককেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে—যেখানে রাতের পর রাত চলত ভোট পরিকল্পনার নানামুখী কার্যক্রম।
বিশেষ করে পুলিশের ক্ষেত্রে গড়ে ওঠে একটি গোপন ‘অর্থ বিতরণ সেল’, যাকে বলা হতো ডিস্ট্রিবিউশন টিম। এই দলের কেন্দ্রীয় দায়িত্বে ছিলেন পুলিশ সদর দপ্তরের লজিস্টিকস অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার সার্কেলের (এলআইসি) তৎকালীন এআইজি আনজুমান কালাম। তার টিম বিভিন্ন জেলায়, রেঞ্জে, মেট্রোপলিটন ইউনিটে এবং বিশেষ বাহিনীগুলোর কাছে পৌঁছে দিত নির্বাচনী অনিয়মের অর্থ। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ভোটের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতিদিনই রাজধানী থেকে জেলা পর্যায়ে যেত বিভিন্ন গাড়িবহর। বস্তাবন্দি টাকা সরবরাহ করা হতো বিশেষ নিরাপত্তার মধ্যে, যা পরে সংশ্লিষ্ট এসপি, কমিশনার, ডিআইজি ও ইউনিট প্রধানদের হাতে তুলে দেওয়া হতো। এভাবে একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে ব্যবহারের জন্য আর্থিকভাবে বশীভূত করা হয়েছিল।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো, পুলিশ বাহিনীর জন্য বরাদ্দ এক হাজার কোটি টাকার মধ্যে মাত্র ১০০ কোটি টাকা সদর দপ্তরে রাখা হয়। বাকি অর্থ বিতরণ করা হয় মাঠপর্যায়ের ইউনিটগুলোতে, যারা সরাসরি ভোটকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ, বিরোধী প্রার্থীর ক্যাম্পে অভিযান, গণগ্রেপ্তার এবং নির্দিষ্ট এলাকায় ‘ভোটের পরিবেশ’ নিশ্চিত করার দায়িত্বে ছিলেন। তবে সেই ১০০ কোটির পুরোটা সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা পাননি। বরং তৎকালীন আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী ব্যক্তিগতভাবে উল্লেখযোগ্য অংশ নিজ নিয়ন্ত্রণে নেন এবং তার ঘনিষ্ঠদের মধ্যে বণ্টন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডিএমপি, সিএমপি, আরআরএফ, এপিবিএন, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও পায় বিপুল অঙ্কের অর্থ। ঢাকার মেট্রোপলিটন পুলিশকে দেওয়া হয় ৫০ কোটি টাকা, চট্টগ্রামকে ১৫ কোটি, অন্য মেট্রোপলিটন ইউনিটগুলো পায় সাত কোটি করে। পুলিশের বিশেষ শাখা, সিআইডি, রেলপথ নিরাপত্তা ইউনিটসহ বিভিন্ন বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা পান কয়েক কোটি থেকে কয়েক দশক কোটি টাকা। র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদও র্যাবের নামে ১০০ কোটি টাকা নেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এই পুরো অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের পেছনে যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল তা খুব স্পষ্ট। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে নানা জরিপ, বিশ্লেষণ এবং মাঠপর্যায়ের ধারণা ছিল যে স্বাভাবিক ভোট হলে সরকার টিকে থাকা কঠিন। তাই আগেই তৈরি করা হয় ‘নিরাপদ ফলাফলের রূপরেখা’। এই ব্লুপ্রিন্ট অনুযায়ী কেন্দ্র দখল, রাতের ভোট, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার ও বিরোধী দলকে কোণঠাসা করার জন্য প্রয়োজন ছিল বিপুল অঙ্কের অর্থ এবং তদবলীক ক্ষমতার চর্চা। নির্বাচনকে ঘিরে তখন যে নিরাপত্তা বাজেট বরাদ্দ ছিল, এই অবৈধ নির্বাচনী তহবিল ছিল তার পাঁচ থেকে সাতগুণ বেশি।
ভোটের আগের রাতের সেই অস্থির পরিবেশে দেশের অধিকাংশ মানুষ তখন জানতেন না যে তাদের ভোটের অধিকার হরণ করে একটি সমন্বিত দুর্নীতির চক্র কাজ করছে। সাধারণ ভোটারদের অজ্ঞাতেই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত একদল লোক রাষ্ট্রের সম্পদ, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে তৈরি করে রেখেছিল অদৃশ্য দখলদারিত্বের জাল। অন্তত আট হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের মাধ্যমে গণতন্ত্রের ভিত্তিকে নড়ে দেওয়ার যে চেষ্টা হয়েছিল, তা এখন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চাঁদাবাজি, ভুয়া ঋণ, টেন্ডারবাণিজ্য বা ক্ষমতার অপব্যবহারের উদাহরণ নতুন নয়। তবে একটি নির্বাচনের ফলকে নিয়ন্ত্রণ করতে এত বড় অঙ্কের তহবিল গঠন এবং তা রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে উদ্দেশ্যমতো ব্যবহারের জন্য ছড়িয়ে দেওয়া—এমন ভয়াবহ চিত্র দেশের ইতিহাসে বিরল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ঘটনা শুধু নির্বাচন নয়, দেশীয় অর্থনীতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ব্যাংকগুলোর ভুয়া ঋণ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ, বিনিয়োগকারীদের আতঙ্ক এবং বাজারে অস্থিরতা—সব মিলিয়ে এটি অর্থনীতিকে ধাক্কা দিয়েছিল দীর্ঘমেয়াদে।
এখন যখন সত্য ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে, তখন দেশের বহু মানুষ এই প্রশ্ন তুলছেন—যে রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, তাদের ভোটের অধিকার রক্ষার কথা, সেই রাষ্ট্রযন্ত্রই কি ব্যবহার হয়েছিল তাদের অধিকার হরণের কাজে? একটি নির্বাচনের জন্য কি পুরো রাষ্ট্রই তখন জিম্মি হয়ে পড়েছিল? যাদের হাতে ক্ষমতা ছিল, তারা কি সচেতনভাবেই গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করেছিলেন?
প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো একদিন বিচার-ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে। তবে আজ যখন আট হাজার কোটি টাকার এই কালো তহবিল, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি এবং ভোট ডাকাতির নেপথ্যের নানান অন্ধকার তথ্য বেরিয়ে আসছে, তখন একথা বলা যায়—২০১৮ সালের নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক নয়, আর্থিক ও নৈতিক দিক থেকেও ছিল দেশের গণতন্ত্রের ওপর এক গভীর আঘাত।










