অল্প বয়সেই যন্ত্রণার সাথী অ্যানকিলোসিং স্পন্ডিলাইটিস

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৯ বার
অল্প বয়সেই যন্ত্রণার সাথী অ্যানকিলোসিং স্পন্ডিলাইটিস

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মেরুদণ্ড ও জয়েন্টের ব্যথা সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দেয়। তবে অনেকেই জানেন না, অল্প বয়সে এমন ব্যথা দেখা দিলে সেটি মারাত্মক একটি রোগের লক্ষণও হতে পারে। অ্যানকিলোসিং স্পন্ডিলাইটিস, সংক্ষেপে এএস, হলো মেরুদণ্ড ও জয়েন্টকে প্রভাবিত করা এমন একটি রোগ, যা তীব্র ব্যথা, জড়তা এবং অস্বস্তি সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সীরা এই রোগের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

রোগের প্রকৃতি বোঝার জন্য বলা যায়, এটি মূলত মেরুদণ্ড, কোমর ও হিপসহ বিভিন্ন জয়েন্টকে প্রভাবিত করে। প্রাথমিক অবস্থায় রোগীকে শুধু কোমর বা ঘাড়ে ব্যথা অনুভূত হয়। তবে ব্যথা দিনের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠার পর ব্যথা তীব্র থাকে, যা কিছুটা কাজের মধ্যে লিপ্ত হলে কমতে শুরু করে। এ ব্যথা অনেক সময় রাতের ঘুমকে ব্যাহত করে। রোগী ব্যথার স্থানে জড়তা অনুভব করে, হঠাৎ নড়াচড়া করা কঠিন হয়। পিঠে শক্তি অনুভূত হয়, ঘাড় ও জয়েন্টেও ব্যথা থাকে।

ডা. রওশন আরা, গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন ও বাতরোগ বিশেষজ্ঞ, বলেন, “এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা পুরুষের মধ্যে নারীর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। পুরুষদের জন্য ঝুঁকি বেশি হলেও নারীরাও আক্রান্ত হতে পারে।” পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুরুষ ও নারীর আক্রান্ত হওয়ার অনুপাত ৩:১।

এ রোগের প্রকৃত কারণ এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পারিবারিক ইতিহাস বা জেনেটিক ফ্যাক্টর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিবারের মধ্যে পূর্বে কেউ এই রোগে আক্রান্ত হলে পরবর্তী প্রজন্মের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই যদি পরিবারের কেউ এএস আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তরুণ বয়সেই জয়েন্ট বা মেরুদণ্ডে ব্যথা অনুভব করলে তা উপেক্ষা করা উচিত নয়।

রোগ নির্ণয়ের জন্য এক্স-রে বা এমআরআই পরীক্ষা করা হয়। এগুলো মেরুদণ্ড ও জয়েন্টে সৃষ্ট প্রদাহ, ক্ষয় এবং অস্বাভাবিক সংযোগ চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। যদিও এই রোগের স্থায়ী নিরাময় নেই, তবুও সঠিক থেরাপি ও ওষুধের মাধ্যমে ব্যথা ও জটিলতা কমানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা ব্যায়াম, ব্যথানাশক ও প্রদাহ হ্রাসকারী ওষুধের সমন্বয় ব্যবহার করেন। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে রোগ ধীরে ধীরে মেরুদণ্ডকে শক্ত বা আড়ষ্ট করে দেয়, হিপ জয়েন্ট অকার্যকর হয়ে যায় এবং চোখে প্রদাহ বা দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। এছাড়া মেরুদণ্ডের অস্বাভাবিক চাপের কারণে ফুসফুস ও হার্টও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

রোগটি সাধারণত ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়। প্রথমদিকে শারীরিক সমস্যা অল্পমাত্রার হতে পারে, তবে নিয়মিত চিকিৎসা না নিলে তা দীর্ঘমেয়াদি ও তীব্র আকার ধারণ করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, অল্প বয়সে কোমর, ঘাড় বা অন্যান্য জয়েন্টে দীর্ঘমেয়াদি ও তীব্র ব্যথা হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এএস রোগের ক্ষেত্রে রোগীর জীবনযাত্রা ও দৈনন্দিন কাজের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। ব্যথা ও জড়তার কারণে চলাফেরা সীমিত হয়, কাজের প্রতি মনোযোগ কমে এবং মানসিক চাপও বৃদ্ধি পায়। তাই শুধুমাত্র ওষুধের উপর নির্ভর না করে, ব্যায়াম, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক যত্নের সমন্বয় করা প্রয়োজন। ব্যায়াম মেরুদণ্ড ও জয়েন্টের নমনীয়তা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং অস্বস্তি কমায়।

ডা. রওশন আরা বলেন, “সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করলে রোগ নিয়ন্ত্রণযোগ্য হয়। ব্যথা ও জটিলতা কমে যায়, জীবনযাত্রা স্বাভাবিকভাবে চলতে থাকে। তবে চিকিৎসা অবহেলা করলে রোগ শুধু বাড়ে এবং অকার্যকর হয়।” এই রোগের জন্য সময়মতো সচেতন হওয়া এবং প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যানকিলোসিং স্পন্ডিলাইটিসের প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তরুণদের মধ্যে যেসব ব্যক্তি কোমর বা ঘাড়ে ব্যথা অনুভব করেন, তাদের প্রাথমিকভাবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। ব্যথা ও জড়তা উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে তা গুরুতর শারীরিক সমস্যা তৈরি করতে পারে।

রোগ সম্পর্কে সচেতনতা এবং প্রাথমিক পদক্ষেপ নিলে, এএস-এর ফলে সৃষ্ট শারীরিক সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ব্যথা ও জটিলতা কমানোর পাশাপাশি জীবনযাত্রার মান বজায় রাখা যায়। তাই অল্প বয়সে কোমর, ঘাড় বা জয়েন্টের ব্যথা, সকালবেলার জড়তা বা দীর্ঘমেয়াদি অস্বস্তি দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা প্রত্যেকের জন্য জরুরি।

অ্যানকিলোসিং স্পন্ডিলাইটিস রোগের প্রকৃত জটিলতা বোঝার জন্য প্রয়োজন সঠিক তথ্য ও সচেতনতা। যারা ইতিমধ্যেই এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, তারা চিকিৎসা ও থেরাপি শুরু করে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখতে পারেন। আর যারা ঝুঁকিতে আছেন, তাদের জন্য নিয়মিত পরীক্ষা, ব্যায়াম এবং সঠিক জীবনধারা অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। এটি শুধু শারীরিক সুস্থতার জন্য নয়, মানসিক ও দৈনন্দিন জীবনের মান উন্নয়নের জন্যও অপরিহার্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত