অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সিদের ফেসবুক ব্যবহার নিষিদ্ধ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৪ বার
অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সিদের ফেসবুক ব্যবহার নিষিদ্ধ

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অস্ট্রেলিয়া সরকার ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য সামাজিক ফেসবুক ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে শিশু ও কিশোরদের মানসিক বিকাশ সুরক্ষিত রাখা এবং তাদের অনলাইনে সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে রক্ষা করার লক্ষ্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক শিশুই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপরাধ বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তাই এই নতুন আইন শিশুদের এই ঝুঁকি থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যেই নেওয়া হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, মেটার অধীনে থাকা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও থ্রেডস প্ল্যাটফর্ম থেকে ১৬ বছরের কম বয়সিদের অ্যাকাউন্ট বাতিল করা হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এই নির্দেশ কার্যকর করার জন্য ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনার আলোকে মেটা কোম্পানি ইতোমধ্যেই তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। মেটার এক মুখপাত্র জানান, কোম্পানি ১৩ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে যারা ব্যবহারকারী, তাদেরকে প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দেওয়া শুরু করেছে।

মেটা বলেছে, “আমরা অস্ট্রেলিয়ান কিশোরদের জানিয়ে দিচ্ছি, তারা ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও থ্রেডস ব্যবহারের অধিকার হারাতে চলেছেন। ৪ ডিসেম্বর থেকে নতুন কোনো ১৬ বছরের নিচে অ্যাকাউন্ট খোলার পথ বন্ধ হবে, এবং বিদ্যমান সব অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীর অ্যাক্সেস বাতিল করা হবে। তবে, বয়স ১৬ বছর পূর্ণ হলে তারা পুনরায় তাদের অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে পারবে।”

এই আইনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একদিকে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে অনেক অভিভাবক এবং শিক্ষাবিদ। তারা মনে করছেন, আধুনিক যুগে শিশুদের প্রযুক্তি ব্যবহারের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকা উচিত, কিন্তু সীমাহীন প্রবেশ তাদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশকে প্রভাবিত করতে পারে। অপরদিকে, কিছু প্রযুক্তি বিশ্লেষক এবং শিশু অধিকার সংস্থা আইনটিকে কঠোর এবং বাস্তবসম্মত নয় বলে সমালোচনা করেছে। ‘দ্য অস্ট্রেলিয়ান চাইল রাইটস টাস্কফোর্স’ উল্লেখ করেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে কিশোরদের সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করা তাদের সামাজিক বন্ধন ও বন্ধুত্বের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেন, “এই আইন কেবল শিশুদের সুরক্ষিত রাখার জন্য। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে শিশুদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব সীমিত করা। তবে আমরা চাইছি, এটি তাদের বন্ধুত্ব এবং কমিউনিটি থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন না করুক।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আজকের শিশুরা অনলাইনে যেমন শিক্ষার সুযোগ পায়, তেমনি ঝুঁকিতেও পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা নানা ধরনের তথ্য, ছবি ও ভিডিও অ্যাক্সেস করতে পারে, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক মূল্যবোধকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই সরকারের এই পদক্ষেপ কিছুটা হলেও শিশুদের নিরাপদ রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, তারা এই নির্দেশনার সঙ্গে পুরোপুরি সহযোগিতা করবে। তবে কোম্পানি একইসঙ্গে আশ্বাস দিয়েছে যে, ১৬ বছর পূর্ণ হওয়া পর ব্যবহারকারীরা আবারও তাদের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে পারবে। মেটার মুখপাত্র আরও বলেন, “আমরা চাই কিশোররা অনলাইনে সুরক্ষিত থাকুক, কিন্তু বন্ধুত্ব এবং কমিউনিটি থেকে বিচ্ছিন্ন না হোক। এই সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।”

শিশুদের অনলাইনে প্রবেশ সীমিত করার বিষয়টি অস্ট্রেলিয়ার বাইরে বিশ্বব্যাপীও নজর কেড়েছে। অনেক দেশ এখন শিশুদের ডিজিটাল সুরক্ষা বিষয়ক নীতি তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ছোট বয়সে অনলাইনে সীমাহীন প্রবেশ শিশুদের আত্মনির্ভরতা, মনোযোগ এবং সামাজিক দক্ষতাকে প্রভাবিত করতে পারে। এছাড়া শিশুদের উপর কৃত্রিম চাপ, মানসিক উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই কিশোরদের জন্য নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এক ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ার সরকার জানিয়েছে, এই আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। এর মাধ্যমে অনলাইন হিংসা, কুপ্রভাব এবং অপব্যবহার থেকে কিশোরদের রক্ষা করা সম্ভব হবে। তবে অভিভাবক ও সমাজকর্মীরা বলছেন, প্রযুক্তি ব্যবহারের শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের জন্য বাড়িতে ও স্কুলে সমর্থন প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শিশুদের সরানো একমাত্র সমাধান নয়। অভিভাবক, শিক্ষক এবং সমাজকর্মীদেরও শিশুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, নিরাপদ অনলাইন ব্যবহার শেখানো এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। তবে এই আইন শিশুদের অপ্রাপ্ত বয়সে অনলাইন ঝুঁকি কমাতে কার্যকর একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ার এই পদক্ষেপ বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর জন্যও একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করতে পারে। শিশু-কিশোরদের সুরক্ষিত অনলাইন পরিবেশ তৈরি করার জন্য সরকারের কঠোর নীতি এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সহযোগিতা একসাথে প্রয়োজন। এর ফলে কিশোররা অনলাইনে শিক্ষার সুযোগ পাবেন, সুরক্ষিত থাকবেন এবং মানসিক ও সামাজিক বিকাশে বাধা আসবে না।

অস্ট্রেলিয়ার এই আইন কার্যকর হওয়ার পর ১৬ বছরের কম বয়সিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার থেকে কিছুটা দূরে থাকলেও তাদের সুরক্ষিত রাখা এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও সচেতনতা প্রদান করা হবে। এটি একদিকে শিশুর সুরক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, অন্যদিকে পরিবার ও সমাজকেও প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারের শিক্ষা দেবে।

অতএব, অস্ট্রেলিয়ার ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত একদিকে শিশুদের সুরক্ষিত রাখার চেষ্টার প্রতিফলন, অন্যদিকে এটি প্রযুক্তি ব্যবহার ও সামাজিক দায়িত্ববোধের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত