ভেনেজুয়েলায় শিগগিরই স্থল হামলা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩০ বার
ট্রাম্পের ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় আবেদন স্থগিত রাখতে পারেন বছরের পর বছর

প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মাদকবিরোধী অভিযানের নামে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা নতুন করে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে এবার সরাসরি স্থল হামলার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক ভিডিও ভাষণে মার্কিন সেনাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলার মাদক চোরাচালানকারীদের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগিরই স্থলপথে সামরিক অভিযান শুরু করবে। ট্রাম্পের বক্তব্য প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ নিয়ে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। যুদ্ধবিমান, নৌবহর ও হাজার হাজার সেনা মোতায়েনের মধ্যেই ট্রাম্পের এমন ঘোষণা লাতিন অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ভিডিও বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভেনেজুয়েলার মাদক চোরাকারবারীদের কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক নজরদারি ও শক্তিশালী প্রতিরোধের কারণে সমুদ্রপথে মাদক পরিবহন এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, “আপনারা হয়তো লক্ষ্য করেছেন—পাচারকারীরা আর সমুদ্রপথে মাদক আনতে সাহস পাচ্ছে না। আমাদের কঠোর নজরদারির কারণে তাদের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আমরা স্থলপথেও তাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করবো।” ট্রাম্প বলেন, খুব শিগগিরই এই স্থল হামলা শুরু হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র মাদকবিরোধী যুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থানে যাবে।

ট্রাম্পের ভিডিও ভাষণটি প্রকাশিত হওয়ার পরপরই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর প্রশাসন তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। গত কয়েক বছর ধরে মাদুরো প্রশাসন অভিযোগ করে আসছে, তাদের সরকারকে অস্থিতিশীল করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। মাদুরোর অভিযোগ, “মার্কিন সরকার আমাদের দেশকে দুর্বল করতে চায়; তারা চায় আমাদের সরকার পতন হোক।” গত কয়েক মাস ধরে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ সংকট, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থার ওপর আন্তর্জাতিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। পরিস্থিতি এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, যেকোনো সামরিক উত্তেজনা অঞ্চলজুড়ে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।

লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি গত কয়েক সপ্তাহ ধরে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, অঞ্চলটিতে একটি বিমানবাহী রণতরী, উন্নত প্রযুক্তির গোপন যুদ্ধবিমান এবং কয়েক হাজার মার্কিন সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে। এসব সামরিক শক্তি মোতায়েন করা হয়েছে বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবে, যার নাম ‘অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ার’। এই অভিযানের লক্ষ্য মাদক পাচার প্রতিরোধ করা হলেও, ভেনেজুয়েলা সরকার দাবি করছে যুক্তরাষ্ট্র এর মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ প্রস্তুত করছে।

পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, ‘অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ার’-এর অংশ হিসেবে গত কয়েক মাসে সমুদ্রপথে মাদকবাহী বিভিন্ন নৌযানে হামলা চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে ৮০ জনেরও বেশি লোক নিহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, এই মৃত্যুগুলো হয়েছে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিতে গিয়ে। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এ ধরনের অভিযানে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বেসামরিক লোকও হতাহত হতে পারে—যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন।

ট্রাম্প তার ভাষণে বলেন, “যারা আমাদের দেশে বিষ পাঠাচ্ছে, তাদের জন্য এটি একটি কঠোর সতর্কবার্তা। যুক্তরাষ্ট্র আর কোনোভাবেই অপরাধীদের দৌরাত্ম্য সহ্য করবে না।” তার এমন কঠোর ভাষা বিশ্লেষকদের মতে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতিরই প্রতিফলন। বিশেষ করে মার্কিন নির্বাচনী রাজনীতিতে মাদকবিরোধী কঠোর অবস্থান দেখানো অনেক সময় জনপ্রিয়তা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অনেকেই মনে করছেন, ট্রাম্প এই ঘোষণা দিয়ে রাজনৈতিকভাবে নিজের অবস্থান মজবুত করার চেষ্টা করছেন।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই ভেনেজুয়েলায় স্থল হামলা চালায়, তাহলে দক্ষিণ আমেরিকার ভূরাজনীতি মারাত্মকভাবে বদলে যেতে পারে। মাদুরো সরকারের প্রতি রাশিয়া, চীন ও কয়েকটি লাতিন আমেরিকার দেশ সমর্থন জানিয়ে আসছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরু হলে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার ইতোমধ্যেই দুর্বল অর্থনীতি আরও ধসের মুখে পড়তে পারে।

ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরেও এই খবর শঙ্কা তৈরি করেছে। ইতোমধ্যেই দেশটিতে খাদ্য সংকট, দাম বেড়ে যাওয়া, বিদ্যুৎ ঘাটতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ভোগান্তিতে আছে। চলমান সংকটের মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা মানুষকে আরও আতঙ্কিত করে তুলেছে। অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করছেন, তারা আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের হস্তক্ষেপ ইতিহাসের এক জটিল অধ্যায়। বহু দেশেই মার্কিন হস্তক্ষেপ সরকার পতন, সামরিক অভ্যুত্থান বা রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। ফলে ভেনেজুয়েলাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে অন্যান্য দেশেও। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া ও বলিভিয়ার রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে—যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত কি সত্যিই মাদকবিরোধী নাকি আরও গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত?

রাশিয়া ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছে, ভেনেজুয়েলায় কোনো ধরনের আগ্রাসী পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হবে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই স্থল হামলায় যায়, তবে তারা এটির তীব্র কূটনৈতিক বিরোধিতা করবে। চীনও একই ধরনের অবস্থান জানিয়েছে।

এদিকে সাধারণ পর্যায়ে প্রশ্ন উঠছে—মাদকবিরোধী অভিযানকে সামনে রেখে আরেকটি সম্ভাব্য যুদ্ধক্ষেত্র সৃষ্টি হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কারা? বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক শক্তির সংঘাত যতই ঘনিয়ে আসুক, ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষই। ভেনেজুয়েলার সংকটের মধ্যে এই সামরিক উত্তেজনা দেশটির ভবিষ্যৎকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।

বর্তমানে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ট্রাম্পের ঘোষণা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় তার একটি ইঙ্গিত দিয়েছে ঠিকই, তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি অনেক সময়ই অনিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলা ও লাতিন আমেরিকার কূটনৈতিক অঙ্গনে এখন তীব্র আলোচনার বিষয়—এই উত্তেজনা কি যুদ্ধের দিকে যাবে, নাকি আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত হবে।

এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পরিস্থিতির দিকে গভীরভাবে নজর রাখছে। আগামী কয়েক দিনেই স্পষ্ট হতে পারে—মার্কিন সামরিক তৎপরতা কি সত্যিই স্থল হামলায় গড়াবে, নাকি এটি কেবলই রাজনৈতিক বার্তা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত