প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
চাঁপাইনবাবগঞ্জে সীমান্তবর্তী এলাকায় গত সোমবার (১ ডিসেম্বর) রাতের অন্ধকারে ঘটেছে এক বিরল ও সমসাময়িক আন্তর্জাতিক নজরকাড়া ঘটনা। বাংলাদেশে বিএসএফের পুশইনের মাধ্যমে প্রবেশ করা অন্তঃসত্ত্বা নারী সোনালী খাতুনসহ ছয় ভারতীয় নাগরিককে আদালতের মাধ্যমে জামিন দেয়া হয়। তবে কারাগার থেকে মুক্তির মাত্র দুই ঘণ্টা পরই তাদের আবার পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়, যা স্থানীয় ও সীমান্তবর্তী এলাকার জন্য নতুনভাবে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
এ ঘটনায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওয়াসিম ফিরোজ সময় সংবাদকে নিশ্চিত করে জানান, ‘জামিনের পর আপাতত এই ছয় ভারতীয় নাগরিককে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় আইনানুগ উদ্যোগ নেওয়া হবে।’ পুলিশের এই পদক্ষেপের প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় জনগণ এবং সীমান্ত সচেতন নাগরিকরা উদ্বিগ্ন।
এর আগে, সোমবার বিকালে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল ইসলাম চার ভারতীয় নাগরিকের জামিন মঞ্জুর করেন। সঙ্গে থাকা দুই শিশু মামলার আসামি হিসেবে গণ্য করা হয়নি। দাফতরিক প্রক্রিয়া শেষে তারা রাত ৮টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান। জামিন প্রাপ্ত ব্যক্তিদের আগামী ৩ ডিসেম্বর আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জামিন প্রাপ্ত ভারতীয় নাগরিকরা হলেন পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার পাকুরের দানিশ শেখ (২৮), তার স্ত্রী সোনালী খাতুন (২৬) এবং তাদের সন্তান সাব্বির শেখ (৮)। এছাড়া সুইটি বিবি (৩৩) এবং তার দুই সন্তান মো. কুরবান দেওয়ান (১৬) ও মো. ইমাম দেওয়ান (৬) অন্তর্ভুক্ত। এই নাগরিকরা মূলত কুড়িগ্রামের সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে পুশইন হয়ে প্রবেশ করেছিলেন।
আসামি পক্ষের আইনজীবী একরামুল হক পিন্টু জানান, ‘অন্তঃসত্ত্বা সোনালী খাতুন যে কোনো সময় সন্তান জন্ম দিতে পারেন। আদালত এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তাকে এবং আরও তিনজনকে জামিন দিয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে দাফন ও স্বাস্থ্য বিষয়ক দিক বিবেচনা করে আদালত এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। জামিন প্রাপ্ত নাগরিকরা স্থানীয় বাসিন্দা ফারুক হোসেনের জিম্মায় থাকেন। মুক্তির পর তারা তার বাড়িতে আসেন এবং রাতের খাবার খাওয়ার পর পুলিশ পুনরায় তাদের হেফাজতে নিয়ে যায়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের নয়াগোলা এলাকায় এই পুনঃহেফাজতের ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে যথেষ্ট উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। শহরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তারা আশ্চর্য ও চিন্তিত যে জামিন প্রাপ্ত ব্যক্তিদের কেন এত দ্রুত আবার পুলিশ হেফাজতে নেয়া হলো। বিষয়টি শুধু আইনগত দিক থেকে নয়, মানবিক দিক থেকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন জানান, এই নাগরিকরা বিএসএফের পুশইনের মাধ্যমে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন। এটি একটি সীমান্ত নিরাপত্তা লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়। তাই আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের পুনরায় হেফাজতে নেয়া হয়েছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এই ধরনের ঘটনা সীমান্তবর্তী এলাকায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং শান্তি বজায় রাখার জন্য পুলিশ প্রশাসনের কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করছে। একই সঙ্গে তারা বলেন, এটি এমন একটি ঘটনা যা দুই দেশের সীমান্ত বিষয়ক সম্পর্ক এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।
মামলার সূত্রে জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গের এই নাগরিকরা মূলত দিল্লীতে কাগজ কুড়ানোর কাজ করতেন। পরে দিল্লী পুলিশ তাদের আটক করে বিএসএফের মাধ্যমে বাংলাদেশে পুশইন করে। ভারতের গণমাধ্যম এই ঘটনা ব্যাপকভাবে প্রচার করেছে এবং বিষয়টি দেশটিতে আলোচনার সৃষ্টি করেছে। কলকাতা হাইকোর্ট ইতিমধ্যেই ২৬ সেপ্টেম্বর এই ছয় ভারতীয় নাগরিককে ফেরাতে চার সপ্তাহ সময় বেঁধে দিয়েছিল।
এই ঘটনায় আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগের মাত্রা বাড়ায় সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলেছেন, এমন পরিস্থিতিতে প্রাথমিকভাবে জামিন এবং পরে হেফাজতের এই দ্বন্দ্বপূর্ণ প্রক্রিয়া সামাজিক ও মানবিক দিক থেকে বিচারযোগ্য হওয়া উচিত।
উপসংহারে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ছয় ভারতীয় নাগরিকের জামিন এবং পুনরায় পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার ঘটনা শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা নয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মানবিক বিবেচনার দিক থেকেও নজরকাড়া ঘটনা হিসেবে ধরা হচ্ছে। প্রশাসন জানিয়েছে, আগামী আদালতের শুনানিতে প্রয়োজনীয় আইনানুগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে এবং নাগরিকদের হেফাজত ও জামিন সংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত আইনের আওতায় নেওয়া হবে।