প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও বিশ্বরাজনীতিতে ঝড় তুলেছেন। ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের ঘোষণা দিয়ে তিনি শুধু লাতিন আমেরিকা নয়, গোটা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। মাদকবিরোধী অভিযানের নামে এই ঘোষণা নতুন করে দুই দেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও উসকে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ট্রাম্প মন্ত্রিসভার বৈঠকে স্পষ্ট ভাষায় জানান, যুক্তরাষ্ট্রের মাদকবিরোধী অভিযান এখন আর শুধু সমুদ্রপথেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং ভেনেজুয়েলার ভেতরে যেখানে ‘মাদক সন্ত্রাসীরা’ অবস্থান করছে, যুক্তরাষ্ট্র সেসব এলাকাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করবে। তার বক্তব্যে ছিল কঠোর হুঁশিয়ারির সুর, যেন ওয়ার্নিং নয়, বরং অভিযানের এক প্রকার পূর্বাভাস।
তিনি বলেন, বিশ্বের যে দেশ বা যে ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাঠানোর চেষ্টা করবে, তারা সবাই মার্কিন হামলার মুখোমুখি হবে। ট্রাম্পের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। সমালোচকদের দাবি, তিনি মাদকবিরোধী অভিযানের আড়ালে সরাসরি ভেনেজুয়েলার সরকারের বিরুদ্ধে হামলার পথ তৈরি করছেন।
এর আগে মার্কিন নৌবাহিনীর অভিযানে ভেনেজুয়েলার সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌকায় দ্বিতীয় দফা ‘ডাবল-ট্যাপ’ হামলার অভিযোগ উঠে। মাদক যুদ্ধে এ ধরনের হামলা সাধারণত প্রাণঘাতী এবং বিতর্কিত বলে পরিচিত। এই ঘটনার পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হয়। ভেনেজুয়েলার পক্ষ থেকে অভিযোগ আনা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে রয়টার্সের একটি বিশেষ প্রতিবেদন। সেখানে দাবি করা হয়, সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সঙ্গে এক গোপন ফোনালাপে ট্রাম্প তাকে এক সপ্তাহের মধ্যে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার ‘আল্টিমেটাম’ দেন। বিনিময়ে মাদুরো ও তার পরিবারকে নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন ট্রাম্প। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই ফোনালাপ চলে প্রায় ১৫ মিনিট।
রয়টার্সের সূত্রমতে, আলোচনায় মাদুরো শর্তসাপেক্ষে দেশ ছাড়ার বিষয়ে সম্মতিও জানান। তবে তিনি দাবি করেন, তাকে ‘পূর্ণ আইনি দায়মুক্তি’ দিতে হবে। পাশাপাশি তার ওপর আরোপিত যুক্তরাষ্ট্রের সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে তার বিরুদ্ধে চলমান মামলা বাতিল করার অনুরোধ করেন। শুধু তাই নয়, ভেনেজুয়েলার আরও ১০০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেওয়ার দাবি করেন তিনি, যাদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি ও মাদক চোরাচালানের অভিযোগ রয়েছে।
কিন্তু ট্রাম্প এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেন এবং স্পষ্টভাবে জানান, তার হাতে মাত্র এক সপ্তাহ সময় আছে। এই সময়ের মধ্যে মাদুরোকে পরিবার নিয়ে নিজের পছন্দের দেশে চলে যেতে হবে। আল্টিমেটাম শেষ হয় গত ২৮ নভেম্বর। এরপরের দিনই ট্রাম্প অবৈধভাবে ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করেন, যা আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের কাছে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
রবিবার ট্রাম্প স্বীকার করেন যে মাদুরোর সঙ্গে তার ফোনে কথা হয়েছে। কিন্তু তিনি আলোচনার বিস্তারিত জানাননি। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলা সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে কারাকাসের ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সূত্র বলছে, মাদুরো সরকারের শীর্ষ মহলে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। একদিকে চলছে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, অন্যদিকে দেশে অর্থনৈতিক সংকট, বিক্ষোভ এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যেও অস্থিরতা বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই অতি-আক্রমণাত্মক অবস্থান শুধু লাতিন আমেরিকাকেই অস্থিতিশীল করবে না, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতের পথও তৈরি করতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অতীতে আফগানিস্তান, ইরাকসহ বহু দেশে সামরিক হস্তক্ষেপ চালিয়ে জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। ভেনেজুয়েলা দক্ষিণ আমেরিকার ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হওয়ায় সেখানকার সামরিক উদ্যোগ পুরো মহাদেশকে অস্থির করে তুলতে পারে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ট্রাম্পের এই ঘোষণা আগামী নির্বাচনের আগেই কঠোর অবস্থান প্রদর্শন এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের কৌশল। অন্যদিকে মাদুরোর সরকারও দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটে চাপে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি চাপ সহ্য করতে ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
বিশ্বরাজনীতির এই সংকটপূর্ণ মুহূর্তে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে তা এখন সময়ই বলে দেবে। তবে একটি কথা স্পষ্ট—ভেনেজুয়েলায় স্থল অভিযানের ঘোষণা আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে নতুন এক উত্তেজনার মুখে দাঁড় করিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা কঠোর অবস্থান এবং মাদুরোর শাসনব্যবস্থার সংকট মিলিয়ে লাতিন আমেরিকার শান্তি ও স্থিতিশীলতা আরও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।