উত্তরা পাসপোর্ট অফিসে টাকার খেলায় ভরসা হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫০ বার
উত্তরা পাসপোর্ট অফিসে টাকার খেলায় ভরসা হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর উত্তরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম, দুর্নীতি এবং দালাল চক্রের বিস্তার নিয়ে অভিযোগ ছিল। কিন্তু সম্প্রতি তদন্তকারী সাংবাদিকদের ক্যামেরায় ধরা পড়ে এমন সব বাস্তবতা, যা সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে আরও প্রবল করেছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই টাকার বিনিময়ে পাসপোর্ট পাওয়া যায়—এমন অভিযোগ যে শুধু কথার কথা নয়, বরং একটি সুসংগঠিত চক্র দীর্ঘদিন ধরে এর মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা উপার্জন করে আসছে, তার প্রমাণ মিলেছে তদন্তে।

পাসপোর্ট একটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার, যা দেশের পরিচয় বহন করে এবং বৈধভাবে বিদেশগমন নিশ্চিত করে। অথচ এই পরিচয়পত্রের জন্য সাধারণ মানুষকে যেখানে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী সব কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হয়, সেখানে দালাল চক্রের কাছে টাকা দিলেই নাকি সব নিয়ম গায়েব হয়ে যায়। ফলে নিয়ম মেনে পাসপোর্ট করতে চাওয়া মানুষ অসহনীয় হয়রানির শিকার হন, আর দালালদের দেওয়া টাকা যেন জাদুর মতো সব বাধা পেরিয়ে দেয়।

উত্তরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে দেখা যায়, অফিসের আশপাশের অন্তত অর্ধশতাধিক স্টেশনারি ও কম্পিউটার দোকানকে কেন্দ্র করে সক্রিয় একটি দালাল চক্র। যারা নিজেদের দোকানকে তথ্যসেবা কেন্দ্র সেজে ভুক্তভোগীদের ফাঁদে ফেলে। সাধারণ গ্রাহক সেজে গেলে তারা দালালি বাণিজ্যের সব বিবরণ নিজেই জানান—কত টাকায় কীভাবে পাসপোর্ট করানো যায়। এমনকি আবেদন নাকচ হওয়ার পরও অতিরিক্ত টাকা দিলেই নাকি যেকোনো জেলার পাসপোর্ট উত্তরা অফিস থেকেই তৈরি করে দেওয়া সম্ভব। তবে গণমাধ্যমের ক্যামেরা নিয়ে সেখানে প্রবেশ করতেই দোকানগুলি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, দোকানদার ও দালালেরা পালিয়ে যান বিভিন্ন দিকে। এই আচরণই অনিয়মের সত্যতাকে আরও স্পষ্ট করে।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

অভিযোগ রয়েছে, দালালদের মাধ্যমে প্রতিদিন আড়াইশ থেকে তিনশ পাসপোর্টের কাজ এই অফিসে সম্পন্ন হয়। প্রতিটি কাজ থেকে কোটি টাকার মতো অবৈধ অর্থ হাতবদল হয় মাস শেষে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একটি সুসংগঠিত শেয়ারিং চক্রের তথ্য। চক্রটিতে রয়েছেন অফিসের নাইট গার্ড বাবু এবং কর্মচারী বশির। তাদের মাধ্যমে অর্থ পৌঁছায় উচ্চমান সহকারী রনি সরকার ও রেকর্ড কিপার সুবির সরকারের কাছে। এরপর ভাগাভাগি পৌঁছায় উপপরিচালকের টেবিল পর্যন্ত। ভুক্তভোগী কয়েকজন জানান, দালালরা আইডি নম্বর দিয়ে ফাইল ‘চ্যানেল’ করে পাঠিয়ে দেন, যার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই কাজ হয়ে যায়। কেউ কেউ স্পষ্টই উল্লেখ করেন যে, উপপরিচালক নুরুল হুদাসহ কিছু কর্মকর্তা এই অনিয়মের ব্যাপারে অবগত এবং সম্পৃক্ত।

দালালদের দাবি অনুযায়ী, টাকার পরিমাণ অনুযায়ী ফাইল ‘পুশ’ করে দেওয়া হয় অফিসে, আর কর্মচারীরাও প্রায়ই সরাসরি সহযোগিতা করেন। বিপরীতে, যারা নিয়ম মেনে কাজ করতে চান এবং দালালদের আশ্রয় নেন না, তাদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়। কখনো কাগজ অসম্পূর্ণ দেখানো হয়, কখনো সিস্টেমে ত্রুটি দেখিয়ে ফাইল আটকে রাখা হয়।

এমন অভিযোগ জানাতে গেলে উত্তরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক নুরুল হুদা সাংবাদিকদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছানোটাই এক নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। আগারগাঁওয়ের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশে কড়া নিষেধাজ্ঞা—ক্যামেরা, মোবাইলসহ যে কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস জমা রেখে প্রবেশ করতে হয়। এখানেও দালালদের দাপট স্পষ্ট, যেন সরকারি ভবনের ভেতরেই তাদের অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ বজায় রয়েছে।

এক সপ্তাহের চেষ্টা শেষে মহাপরিচালকের অনুমতি নিয়ে কথা বলেন প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের পরিচালক শিহাব উদ্দীন। তিনি বলেন, অভিযোগের প্রমাণ হাতে এলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে চলা এই চক্র ভেঙে ফেলা কতটা সম্ভব—তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন থেকেই যায়।

সাধারণ মানুষ মনে করেন, পাসপোর্ট অফিসের ভেতরে যদি দালালদের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী হয়, তবে শুধু দালাল নয়, অভ্যন্তরীণ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতা ছাড়া এই দুর্নীতি কখনোই এভাবে বিস্তৃত হতে পারে না। আর এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ নাগরিকেরা, যারা নিয়ম মেনে কাজ করতে চান, কিন্তু হয়রানির শিকার হন প্রতিনিয়ত। এমনকি কেউ কেউ মাসের পর মাস অপেক্ষা করার পর পাসপোর্ট পান, আর দালালদের মাধ্যমে জমা পড়া আবেদন কয়েক দিনের মধ্যেই তৈরি হয়ে যায়।

পাসপোর্ট অফিস সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যেখানে নাগরিকদের আস্থা সবচেয়ে বেশি থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তব চিত্র এই আস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয় করছে। টাকার বিনিময়ে কাজ হওয়ার প্রবণতা কেবল অনিয়মই নয়, বরং দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থারও বড় ঝুঁকি। কারণ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া পাসপোর্ট ইস্যু হওয়ার ফলে অপরাধী কিংবা প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও সহজেই বৈধ পরিচয়পত্র পেয়ে যেতে পারে।

অতি দ্রুত এই অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে জনসাধারণের ভোগান্তি বাড়বে, দালালদের দৌরাত্ম্য আরও শক্তিশালী হবে, এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাই স্বচ্ছ তদন্ত, কঠোর মনিটরিং এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি আনা এখন সময়ের দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত