প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ১৯৬৭ সালের ইসরাইলি দখলদারিত্ব অবসান এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পাস হয়েছে। মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) ‘ফিলিস্তিন প্রশ্নের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি’ সংক্রান্ত এই প্রস্তাবটি সাধারণ পরিষদে অভূতপূর্ব সমর্থন পায়। খসড়া প্রস্তাবটি যৌথভাবে উত্থাপন করে জিবুতি, জর্ডান, মৌরিতানিয়া, কাতার, সেনেগাল ও ফিলিস্তিন। ভোটাভুটিতে ১৫১টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট প্রদান করে, বিপক্ষে মাত্র ১১টি দেশ এবং ১১টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।
জাতিসংঘে পাস হওয়া এই প্রস্তাবে ফিলিস্তিনের প্রশ্নে জাতিসংঘের দায়িত্ব পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রস্তাবের মাধ্যমে ১৯৬৭ সালের ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান এবং দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানকে সমর্থন করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার জন্য ইসরাইলকে বসতি স্থাপন কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
যদিও জাতিসংঘে এ ধরনের সমর্থন এসেছে, ফিলিস্তিনে হামলা থামছে না। গাজা শহরের জেইতুন এলাকায় ইসরাইলি সেনার গুলিতে দুই শিশু নিহত হয়েছে। এতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ হাজার ১১৭ জনে, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহত হয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার ৯৯৯ জন। গাজার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরেও হামলা অব্যাহত রয়েছে। বুধবার পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলে তুবাস শহর এবং জেনিনের দক্ষিণে কাবাতিয়ায় ইসরাইলি অ্যাপাচি যুদ্ধ হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, মার্কিন তৈরি অ্যাপাচি হেলিকপ্টারগুলো তুবাসের ওপর একাধিক রাউন্ড গুলি ছোড়ে এবং পুরো সন্ধ্যায় গুলির শব্দ শোনা যায়। লক্ষ্যবস্তু এলাকাগুলোর নাম এখনো জানা যায়নি এবং এখনও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ফিলিস্তিনের জন্য লড়াই এবং মানবাধিকার সংরক্ষণে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সক্রিয়। গত দুই বছরে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইল কমপক্ষে এক হাজার ৮৫ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং আরও হাজার হাজারকে আটক করেছে। এ সময়ে ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষ নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, যার মধ্যে শিশু ও নারী সবচেয়ে ভুক্তভোগী।
মানবাধিকার বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব পাস হওয়া ফিলিস্তিনিদের জন্য কূটনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। এটি শুধু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ইঙ্গিত দেয় যে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে দখল ও অব্যবস্থাপনা বন্ধ করতে হবে, বরং এটি ইসরাইলকে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি দায়বদ্ধ হতে উদ্বুদ্ধ করে।
ফিলিস্তিনি জনগণের চোখে জাতিসংঘের এই সমর্থন তাদের দীর্ঘদিনের আশা ও মানবিক দাবিকে সান্ত্বনা দেয়। ফিলিস্তিনি নেতারা বলেন, শান্তি অর্জনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তারা আশা করছেন, সাধারণ পরিষদে পাস হওয়া প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও বসতি স্থাপনের কারণে ফিলিস্তিনের নাগরিকরা প্রতিনিয়ত মানবিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি শুধুমাত্র স্থানীয় শান্তি ও নিরাপত্তা নয়, বরং আন্তর্জাতিক শান্তিকেও হুমকির মুখে ফেলে। তাই জাতিসংঘের এই পদক্ষেপকে একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও বারবার ইসরাইলকে ফিলিস্তিনে শিশু ও অসহায় নাগরিকদের ওপর হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানাচ্ছে। শিশুদের ওপর হামলা, স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্যাভাবে সংকট, এবং স্কুল ও হাসপাতাল ধ্বংসের ঘটনাগুলো ফিলিস্তিনে মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে।
ফিলিস্তিনি অধিবাসীরা বিশ্বাস করেন, দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান ছাড়া ফিলিস্তিনে স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব পাস হওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তাদের দায়িত্ববোধের অংশ হিসেবে ফিলিস্তিনে শান্তি প্রক্রিয়া চালু করতে উৎসাহিত করবে। বিশেষ করে শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এই প্রক্রিয়ার অন্যতম মূল উদ্দেশ্য।
ফিলিস্তিনে ইসরাইলি দখলদারিত্ব অবসান এবং শান্তিপূর্ণ সমাধান অর্জন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি মানবিক সহমর্মিতার প্রকাশ। জাতিসংঘের পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন বাস্তবায়িত হলে ফিলিস্তিনে নিরাপদ জীবন এবং দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।
সবমিলিয়ে, ফিলিস্তিনে ইসরাইলি দখলদারিত্ব অবসান এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘে প্রস্তাব পাসের ঘটনা কেবল রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, এটি মানবাধিকার, নিরাপত্তা ও শিশুদের ভবিষ্যতের সুরক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।