চামান সীমান্তে ভয়াবহ সংঘর্ষে ২৩ আফগান সেনা নিহত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৩১ বার
আফগান সেনা নিহত

প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের দীর্ঘদিনের অস্থির সীমান্ত পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দুই দেশের সামরিক উত্তেজনা নতুন করে বেড়ে গেছে বেলুচিস্তানের চামান সীমান্তে টানা দুইদিনের সংঘর্ষে কমপক্ষে ২৩ আফগান সেনা নিহত হওয়ার পর। পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর তীব্র গোলাবর্ষণে আফগান বাহিনীর তিনটি সীমান্ত চৌকি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়। সীমান্তের উভয় দিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে। এ ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিশ্বাসঘাটতির সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পাকিস্তানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আফগান বাহিনী প্রথমে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে বিনা উস্কানিতে বেলুচিস্তানের চামান সেক্টরে গুলি চালায়। জিও নিউজ পাকিস্তানি সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, আফগানিস্তানের গুলিবর্ষণের জবাবেই পাল্টা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে পাকিস্তান। সূত্রগুলো বলছে, সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর তা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে থেমে থেমে চলতে থাকে। পরিস্থিতি দ্রুতই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং সীমান্তজুড়ে বিস্ফোরণের শব্দে থমথমে পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, প্রথম দফার হামলার সময় তারা রকেট লঞ্চার, মর্টার এবং ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে। এতে তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগান বাহিনীর তিনটি পোস্ট সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। পাকিস্তানের দাবি, আফগান বাহিনী যাতে পাল্টা জবাব দিতে না পারে, সে জন্য তারা পরবর্তীতে আরও ভারী অস্ত্র মোতায়েন করে। এর মধ্যে ছিল কামান, ভারী রকেট লঞ্চার এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। আফগান পোস্টগুলোতে আগুন ধরে যায়, বিস্ফোরণ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। সীমান্ত এলাকায় উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাতভর গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

পাকিস্তানি সূত্রগুলো আরও জানায়, সাধারণ আফগান নাগরিকদের ক্ষতি এড়ানোর জন্য তারা ‘নির্ভুল অস্ত্র’ বা প্রিসিশন উইপন ব্যবহার করেছে। এ দাবি কতটা সত্য তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে সংঘর্ষ চলাকালে বেসামরিক নাগরিকরা ব্যাপকভাবে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল বলে জানা গেছে। সীমান্তের আফগান পাশের গ্রামগুলো থেকে অনেকে তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। গোলাগুলির শব্দ ও বিস্ফোরণ শিশু ও নারীদের চরম আতঙ্কের মধ্যে ফেলেছিল।

একটি সূত্র জানিয়েছে, পাকিস্তানের প্রথম হামলার পর আফগান তালেবান সেনারা জনবহুল এলাকায় সরে যায়। সেখানে অবস্থান নিয়ে তারা আবার গুলিবর্ষণ শুরু করে। এরপর পাকিস্তানও ওই জনবহুল এলাকায় ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে পাল্টা হামলা চালায়। এ ধরনের হামলা বেসামরিক মানুষের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছে। সীমান্তের উভয় পাশে মানবিক পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে ওঠার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চামান সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু। অতীতে এই অঞ্চল দিয়ে নিয়মিতই সীমান্ত সংঘর্ষ, অস্ত্র চোরাচালান, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং আন্তঃদেশীয় মাদক বাণিজ্যের ঘটনা ঘটেছে। পাকিস্তানের দাবি, আফগানিস্তান থেকে সন্ত্রাসীরা নিয়মিতভাবে তাদের সীমান্তে হামলা চালায় এবং তালেবান সরকার এ ধরনের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ। অপরদিকে আফগানিস্তান অভিযোগ করে, পাকিস্তান সীমান্ত এলাকাগুলোতে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি করে এবং তালেবান প্রশাসনকে অস্থিতিশীল করতে চায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উভয় দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অবিশ্বাস, নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট জটিলতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতি পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে। দুই দেশের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কও বহুদিন ধরে উত্তেজনার মধ্যে রয়েছে। তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের ওপর অভিযোগ রয়েছে যে তারা তালেবানকে অনেক ক্ষেত্রে সমর্থন করলেও বাস্তবে সীমান্ত সুরক্ষায় কঠোর অবস্থান নেয়। ফলে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

এই সংঘর্ষের পর আফগানিস্তানের তরফ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তালেবান সরকারের মুখপাত্ররা সাধারণত এ ধরনের ঘটনার জন্য পাকিস্তানকেই দায়ী করে থাকে। তাদের দাবি, পাকিস্তানি সেনারা প্রায়ই আফগান সীমান্তের ভেতরে ঢুকে আগ্রাসন চালায়। তবে এবার পাকিস্তানের দাবি দৃঢ়ভাবে জানানো হয়েছে যে আফগান বাহিনীই প্রথম গুলি ছোড়ে।

চামান সীমান্তে এই সংঘর্ষ এমন সময় ঘটল, যখন দুই দেশই অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত। পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তা হুমকি এবং অর্থনৈতিক সংকট চলছে। অপরদিকে আফগানিস্তান দারিদ্র্য, মানবিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাবে কঠিন সময় পার করছে। সংঘর্ষের এই পরিস্থিতি সীমান্তের সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। দুই দেশের কর্তৃপক্ষ সীমান্ত বন্ধ করে দিলে হাজারো পরিবার বাণিজ্য, চিকিৎসা ও যাতায়াতের সুযোগ হারায়।

এই ঘটনার ফলে চামান সীমান্তে উত্তেজনা আরও বেড়ে যেতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের রিপোর্ট পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগতে পারে। কারণ উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে।

আন্তর্জাতিক মহল ইতোমধ্যে দুই দেশকে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, সীমান্তে ভারী অস্ত্রের ব্যবহার বেসামরিক নাগরিকদের মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে সংঘর্ষ যেহেতু জনবহুল এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে, সে ক্ষেত্রে মানবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে।

চামান সীমান্তের সংঘর্ষ নতুন নয়; কিন্তু এবার প্রাণহানি এবং ধ্বংসের মাত্রা একে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। পরিস্থিতি কোনদিকে যেতে পারে, সে বিষয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। সীমান্তের মানুষজন শান্তি ও স্থিতিশীলতার অপেক্ষায় থাকলেও দুই দেশের রাজনৈতিক অবস্থান ও সামরিক উত্তেজনা এই প্রত্যাশাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত