প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী বলেছেন, দেশের প্রতিটি নাগরিককে সমানভাবে ডিজিটাল সেবার আওতায় আনতে হলে সেবা–উদ্ভাবনের প্রাথমিক স্তর থেকেই প্রবেশযোগ্যতাকে বাধ্যতামূলক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তাঁর মতে, সরকার দেশের প্রতিটি অঞ্চলে দ্রুতগতির ডিজিটাল অবকাঠামো বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন প্রয়োজন সব নতুন সেবাকে এমনভাবে ডিজাইন করা, যাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রবীণ নাগরিক, প্রযুক্তি–অপরিচিত মানুষসহ সবাই সমানভাবে ব্যবহার করতে পারেন এবং কেউ ডিজিটাল উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে না থাকে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিডা অডিটোরিয়ামে এসপায়ার টু ইনোভেট প্রোগ্রাম ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি বাংলাদেশ আয়োজিত ‘ইনোভেশন টু ইনক্লুশন ইন দ্য ডিজিটাল এইজ’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এ কথা বলেন। সেমিনারে বক্তারা ডিজিটাল বৈষম্য, প্রযুক্তিগত অন্তর্ভুক্তি, অনলাইন সেবায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভবিষ্যতের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশের যাত্রা বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অব্যাহত রয়েছে এবং ইতোমধ্যে সারা দেশে সেবাকেন্দ্র, উচ্চগতির ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল সমাধান, ই-গভর্নমেন্ট সেবা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠেছে। কিন্তু এই উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন দেশের প্রতিটি মানুষ সমানভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, ডিজিটাল সেবার মূল উদ্দেশ্য কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়; বরং এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা যেখানে প্রযুক্তি সবার জীবনে সমান সুবিধা নিশ্চিত করবে।
তিনি আরও বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশ প্রযুক্তিগত উন্নয়নে এগিয়ে গেলেও প্রবেশযোগ্যতা নিশ্চিত করতে পিছিয়ে রয়েছে। অথচ শুরু থেকেই নীতিমালা এবং সেবা কাঠামোয় অন্তর্ভুক্তিমূলক নকশা যুক্ত থাকলে ডিজিটাল বৈষম্য অনেকটাই কমে যায়। বাংলাদেশ এই বিষয়ে একটি অগ্রগামী ভূমিকা নিতে পারে, যদি সব সরকারি-বেসরকারি সেবা শুরু থেকেই সবার জন্য উন্মুক্ত এবং সহজব্যবহারযোগ্য করে তৈরি করা হয়।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. সাইদুর রহমান খান বলেন, প্রবেশযোগ্যতা কেবল একটি প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি মানুষের মর্যাদা, সম্মান ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত। যেসব মানুষ সহজ একটি অনলাইন সেবা ব্যবহার করতে পারেন না, তারা প্রায়ই নিজেকে সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করেন। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রবীণ নারী-পুরুষ, স্বল্পশিক্ষিত জনগোষ্ঠী ও দরিদ্র মানুষেরা প্রযুক্তি ব্যবহারে নানা বাধার মুখে পড়েন। তাই ডিজিটাল সেবা এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে তারা নিজের উদ্যোগেই প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে পারেন এবং কারও ওপর নির্ভরশীল হতে না হয়।
তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, যদি তা মানুষের ব্যবহার-বান্ধব না হয় তবে সেটি সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে না। তাই সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত সেবা–উদ্ভাবন প্রক্রিয়ায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করা এবং সমাজের সব শ্রেণির মানুষের অভিজ্ঞতা ও চাহিদাকে মূল্য দেওয়া।
সমাপনী বক্তব্যে এটুআই–এর প্রকল্প পরিচালক আব্দুর রফিক বলেন, ডিজিটাল বৈষম্য দূর করা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। বাস্তবমুখী ও ন্যায়সঙ্গত সমাধান তখনই সম্ভব, যখন নীতিনির্ধারক, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, উন্নয়ন অংশীদার, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মীরা একসঙ্গে কাজ করেন। ডিজিটাল বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নিতে হলে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা অপরিহার্য।
তিনি জানান, এটুআই গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন ডিজিটাল প্লাটফর্মে প্রবেশযোগ্যতা বৃদ্ধির কাজ করছে। ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সরকারি পোর্টাল এবং ই-সেবা প্লাটফর্মগুলো ধীরে ধীরে প্রবেশযোগ্যতার মানদণ্ড অনুসরণ করছে। তবে এখন পুরো দেশের ডিজিটাল ব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার সময় এসেছে, যাতে কেউ প্রযুক্তিগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়।
সেমিনারে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, এটুআই, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল, সমাজসেবা অধিদপ্তর, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান, মোবাইল অপারেটর, ব্যাংক, ডিজিটাল পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী, অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল অ্যাক্সেসিবিলিটি বিশেষজ্ঞ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তাঁরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ডিজিটাল উন্নয়ন তখনই সফল হবে, যখন দেশের প্রতিটি মানুষ প্রযুক্তিকে নিজেদের জীবনমান উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন।
দিনব্যাপী এই সেমিনারে বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, ডিজিটাল যুগে অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্ভাবন না হলে উন্নয়ন স্থায়ী হয় না। প্রযুক্তিতে সমতার সুযোগ নিশ্চিত করা হলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে, দক্ষ জনবল তৈরি হবে এবং সবার জন্য একটি মানবিক ও সুযোগ–সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে উঠবে।