প্রকাশ: ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজধানীতে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। এমন এক পরিস্থিতিতে ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি নির্বাচনী প্রচারণাকালে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। শুক্রবার দুপুরে বিজয়নগরের কালভার্ট এলাকার রাস্তার ওপর এ হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে রাজধানীর নির্বাচনী পরিবেশ মুহূর্তেই উত্তপ্ত হয়ে উঠে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুরের দিকে অনুসারী ও কর্মীদের নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় হঠাৎ করে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা তার দিকে গুলি ছোড়ে। গুলিটি তার শরীরে আঘাত করলে উপস্থিত কর্মীরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে জরুরি বিভাগে চিকিৎসকরা তাকে ভর্তি করেন এবং অবস্থা স্থিতিশীল করার চেষ্টা চালান। খবর মিলতেই হাসপাতালের সামনে তার দলীয় নেতা-কর্মী, স্বজন ও সাধারণ মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. ফারুক ঘটনাটি নিশ্চিত করে জানান, “গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন। আরও বিস্তারিত জানতে আমরা চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলছি।” ঘটনাটির খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীও সতর্ক হয়ে ওঠে এবং হাসপাতাল এলাকায় অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়।
এদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, “আমরা খবর পেয়েছি যে বিজয়নগর এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তবে ঘটনাস্থলের তথ্য নিশ্চিত করার জন্য আমরা টিম পাঠিয়েছি। টিম নিশ্চিত করলে আমরা বিস্তারিত জানাতে পারব।” তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং কে বা কারা হামলা চালিয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রাজধানীর বিজয়নগর দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রচারণা, পোস্টারিং, মিছিল ও পথসভায় সরগরম থাকে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবেই পরিচিত। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে এলাকায় নির্বাচনমুখী উত্তেজনা আরও বাড়ছে। ঠিক এমন সময়েই এ ধরনের হামলা ঘটায় অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দুপুরের ব্যস্ত সময়ে হঠাৎ গুলির শব্দে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। প্রচারণায় থাকা কয়েকজন কর্মী দাবি করেন, কয়েকজন মুখোশ পরা দুর্বৃত্ত ঘটনাস্থলের নিকটবর্তী একটি গলির দিক থেকে এসে দ্রুত গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনার পরই সেখানে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং অনেকেই নিরাপত্তার জন্য দৌড়ে আশ্রয় নেন।
শরিফ ওসমান হাদি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, সংস্কার এবং সামাজিক পরিবর্তনের বার্তা তিনি প্রচারণায় নিয়মিত তুলে ধরছিলেন। নির্বাচনী ইতিহাসে তাকে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী প্রাণবন্ত মুখ হিসেবেই দেখা হয়। তার ওপর হামলা হওয়ায় সেই তরুণ সমর্থকেরাও বেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিন্দার ঝড় বইতে থাকে। অনেকেই এটিকে পরিকল্পিত হামলা বলে দাবি করছেন। কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচনী পরিবেশকে অস্থিতিশীল করতে এ ধরনের সহিংসতা চালানো হচ্ছে। আবার কেউ কেউ দাবি করছেন, প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের কর্মীরা ভয়ভীতি ছড়ানোর উদ্দেশ্যে এ হামলা চালাতে পারে। যদিও এসব অভিযোগ এখনো যাচাই-বাছাইয়ের অপেক্ষায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের হামলা নির্বাচনী পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং জনআস্থা—সবকিছুর প্রতি আঘাত হানে। তারা মনে করিয়ে দেন, নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা যেন নির্ভয়ে প্রচারণা চালাতে পারেন, তা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিশেষ করে রাজধানীতে যেকোনো ধরনের সহিংসতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বড় ধরনের অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করে।
হাসপাতালের চিকিৎসকদের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, ওসমান হাদির শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তিনি চেতনা ফিরে পেয়েছেন কি না এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হতে পারে।
ঘটনার পর নির্বাচনী এলাকায় ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই নিজেদের প্রচারণা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছেন। বিশেষ করে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছেন। এলাকাবাসীও আশা করছেন, দ্রুত দোষীদের শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে এই গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতার আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন এই আলোচনা—নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, নিরাপত্তা ও সহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতি রক্ষা করা ততই জরুরি হয়ে দেখা দিচ্ছে।
ওসমান হাদির চিকিৎসা ও তদন্ত—দুটি বিষয়ই এখন গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে পুলিশ, রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষ। দিন শেষে প্রত্যাশা একটাই—এ হামলার পেছনে জড়িতদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা এবং নির্বাচনী শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।