প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বরে ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি গত শুক্রবার সন্ত্রাসী হামলায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর চিকিৎসা চলছে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে। তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ড হাদিকে কনজারভেটিভ ম্যানেজমেন্টে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, হাদির শারীরিক অবস্থার উন্নতির জন্য সব ধরনের মনিটরিং এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অব্যাহত রাখা হবে। এদিকে, হাদিকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন একজনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ, যার নাম ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান।
সন্দেহভাজন ফয়সালের পরিচয় সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জটিল। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সূত্র অনুযায়ী, ফয়সাল করিম দাউদ খান কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০১৯ সালের ১১ মে ঘোষিত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ কমিটিতে তিনি সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। সে সময় থেকে তার রাজনৈতিক কার্যক্রম নিয়ে বিশেষ নজর রাখা হয়। ফয়সালের রাজনৈতিক দিকের পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত পরিচয় ও পেশাগত কর্মকাণ্ডও ধীরে ধীরে প্রকাশিত হচ্ছে।
ফয়সালের কিছু ছবি হাদির প্রতিষ্ঠিত ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারসহ বিভিন্ন স্থানে তোলা হয়েছে। এই ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবিতে ফয়সালের চেহারার সঙ্গে হামলার ঘটনায় থাকা আততায়ীর চেহারার সাদৃশ্য থাকায় পুলিশ তাকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানায়, হাদির ওপর গুলির ঘটনা ধরা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে।
এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ৫০ লাখ টাকার পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন, যাতে কেউ হাদিকে গুলি করা ব্যক্তিকে ধরিয়ে দিতে সাহায্য করে। ডিএমপি সব শ্রেণির নাগরিকদের তথ্য দিতে অনুরোধ করেছে, যা তদন্তকে আরও কার্যকর করতে সহায়তা করবে।
ফয়সাল করিমের পেশাগত জীবন সম্পর্কে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার লিংকডইন প্রোফাইলে তিনি নিজেকে অ্যাপল সফট আইটি, ওয়াইসিইউ টেকনোলজি এবং এনলিস্ট ওয়ার্ক নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। লিংকডইনে উল্লেখ আছে, ফয়সাল ২০১৩ সালে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন এবং পরে আরেকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় ফয়সাল গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের সঙ্গে মাঠে সক্রিয় ছিলেন। ছাত্রলীগের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, ওই সময় তার উপস্থিতি ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল।
ফয়সালের নাম হাদিকে গুলি করার ঘটনায় প্রকাশিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও দেশের রাজনীতির উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের ছবি ছড়িয়েছে। ফেসবুকে প্রকাশিত ছবিতে বাংলাদেশের দুইবারের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে তার উপস্থিতি ধরা পড়েছে।
একটি প্রথম সারির গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে, হাদির ওপর গুলির ঘটনায় নাম আসা ফয়সাল করিম এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য ফয়সাল করিম দাউদ খান একই ব্যক্তি। এ তথ্য অনুসারে, তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।
উল্লেখ্য, শরিফ ওসমান হাদিকে লক্ষ্য করে এই হামলা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নয়া উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। হাদির ওপর গুলি ছোড়ার ঘটনায় জাতীয় রাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রভাব বিবেচনা করে সরকারের পাশাপাশি নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পুলিশ ও তদন্ত সংস্থাগুলো ঘটনার সাথে যুক্ত সকল প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষী এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দোষীদের সনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তদন্তের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রশাসনও নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সহমর্মিতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হাদিকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিত এই হামলা রাজনৈতিক সহিংসতা ও নির্বাচনী প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। হামলার ঘটনায় রাজনৈতিক নেতারা এবং সাধারণ নাগরিকরা উদ্বিগ্ন এবং দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছেন।
হাদির চিকিৎসা চলাকালীন তার পরিবার, রাজনৈতিক সংগঠন ও সমর্থকরা হাসপাতালে অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও আশঙ্কার মিলিত অনুভূতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মেডিকেল বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, হাদির অবস্থা এখনও গুরুতর, তবে চিকিৎসা সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তিনি সচেতন থাকলে নিয়মিত মস্তিষ্ক এবং রক্তের পরীক্ষা করা হবে, যাতে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি পর্যবেক্ষণ করা যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে ফয়সাল করিমের নামের প্রকাশ ও তার রাজনৈতিক পরিচয় মিডিয়ায় আলোচিত হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, এই ঘটনায় স্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া কেউ অনুমান বা অযথা বিবৃতি প্রদান করবেন না। জনগণ ও সংবাদমাধ্যমকে দায়িত্বশীল হতে বলা হয়েছে, যাতে তদন্ত প্রক্রিয়া প্রভাবিত না হয় এবং সত্যতা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
হাদিকে লক্ষ্য করে করা হামলা শুধু তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই ঘটনায় সরকারের কঠোর মনোভাব, পুলিশি তৎপরতা এবং নাগরিকদের সহমর্মিতা জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বসহকারে প্রতিফলিত হচ্ছে।
ফয়সাল করিম দাউদ খানের সন্দেহভাজন পরিচয় এবং তার রাজনৈতিক ও পেশাগত পটভূমি যেভাবে ধীরে ধীরে প্রকাশ হচ্ছে, তা আগামী দিনে ঘটনার তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করবে। একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সাধারণ জনগণের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যা দেশে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন এবং রাজনৈতিক নিরাপত্তার ওপর আলোকপাত করবে।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও সরকার একযোগে কাজ করে নিশ্চিত করছে, যে হাদির ওপর হামলার সঙ্গে যুক্ত যে কোনো ব্যক্তি আইন অনুসারে শাস্তি পাবেন। প্রাথমিকভাবে ফয়সাল করিম দাউদ খানকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, তদন্তের মাধ্যমে ঘটনা ও দায়ীদের পূর্ণ চিত্র উদ্ভাসিত হবে।










