প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বরে ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর রাজনীতিতে আলোচিত মুখ ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনায় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি শনাক্ত করা হয়েছে এবং এর মালিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ঘটনায় একদিকে যেমন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা দৃশ্যমান হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি হামলার পেছনের নেটওয়ার্ক, পরিকল্পনা ও সহযোগীদের শনাক্ত করতে তদন্ত আরও গভীর পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
রোববার ১৪ ডিসেম্বর এক খুদে বার্তায় পুলিশ জানায়, হামলার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির মালিক আব্দুল হান্নানকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি মোটরসাইকেলটির মালিকানা স্বীকার করেছেন এবং কীভাবে ও কোন পরিস্থিতিতে ওই মোটরসাইকেল হামলার ঘটনায় ব্যবহৃত হয়েছে, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এই গ্রেফতার হামলার ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র উন্মোচন করেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ওসমান হাদির ওপর হামলার পর ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, ট্রাফিক ক্যামেরার ভিডিও এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা বিশ্লেষণ করে মোটরসাইকেলটির নম্বর ও চলাচলের গতিপথ শনাক্ত করা হয়। পরে সেই সূত্র ধরে মোহাম্মদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে মোটরসাইকেলটির মালিককে গ্রেফতার করা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, মোটরসাইকেলটি কেবল একটি যানবাহন নয়, বরং হামলার পুরো পরিকল্পনা ও সহযোগী নেটওয়ার্ক উন্মোচনে এটি একটি কেন্দ্রীয় সূত্র হিসেবে কাজ করবে।
এই ঘটনার পাশাপাশি, ওসমান হাদির ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে আলোচিত ফয়সাল করিম মাসুদকে বহন করা মোটরসাইকেলের চালককে শনাক্ত করার দাবি করেছে ডিজিটাল অনুসন্ধানমূলক সংবাদমাধ্যম দ্য ডিসেন্ট। সংবাদমাধ্যমটির প্রকাশিত অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বাইকের চালকের নাম আলমগীর হোসেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ব্যবহৃত নাম মোহাম্মদ আলমগীর শেখ। দ্য ডিসেন্টের দাবি অনুযায়ী, আলমগীরের ফেসবুক প্রোফাইল, পোস্টের জিওট্যাগ এবং বিভিন্ন ছবির তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আলমগীর তার ফেসবুক পোস্টে নিয়মিতভাবে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আদাবর এলাকার ‘সুনিবিড় হাউজিং’ লোকেশন ব্যবহার করতেন। একই সঙ্গে তার প্রোফাইলে থাকা একাধিক ছবির সঙ্গে ওসমান হাদির গণসংযোগ কার্যক্রম চলাকালে তোলা কিছু ছবির তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, গত ৫ ও ১২ ডিসেম্বর হাদির প্রচারণার সময় তিনি ও তার সঙ্গীরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এমনকি ৫ ডিসেম্বর শিল্পকলা একাডেমি এলাকায় অনুষ্ঠিত হাদির নির্বাচনী প্রচারণাতেও আলমগীরের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে বলে দাবি করা হয়।
এই তথ্য প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, কীভাবে একজন ব্যক্তি প্রকাশ্যে রাজনৈতিক প্রচারণায় উপস্থিত থেকে পরবর্তী সময়ে এমন একটি সহিংস ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। আবার অনেকে সতর্ক করে বলছেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এ বিষয়ে সংযত অবস্থান নিয়েছে এবং জানিয়েছে, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যগুলো গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করা হচ্ছে, তবে আনুষ্ঠানিক তদন্তের বাইরে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হবে না।
এদিকে, হামলার পর থেকে ওসমান হাদি রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার অবস্থা গুরুতর হলেও স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চলছে। এই হামলা শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ওপর আঘাত নয়, বরং এটি দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচনপূর্ব পরিবেশ এবং মত প্রকাশের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষ এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন এবং দ্রুত বিচার ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, হামলার পেছনে ব্যক্তিগত আক্রোশ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নাকি সংগঠিত কোনো গোষ্ঠীর পরিকল্পনা—সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মোটরসাইকেল শনাক্ত ও মালিক গ্রেফতার হওয়ার ঘটনাকে তারা তদন্তের একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে সন্দেহভাজন চালক ও গুলিবর্ষণকারী সম্পর্কে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনায় ডিজিটাল অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য, জিওট্যাগ, ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে যে ধরনের সূত্র পাওয়া যাচ্ছে, তা তদন্তে সহায়ক হতে পারে। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলছেন, যাচাই-বাছাই ছাড়া এসব তথ্য প্রচার হলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। সে কারণে গণমাধ্যম, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নাগরিকদের সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় মোটরসাইকেল শনাক্ত ও মালিক গ্রেফতার হওয়ার খবর অনেকের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, তদন্ত দ্রুত শেষ হবে এবং প্রকৃত দোষীরা আইনের আওতায় আসবে। নির্বাচনপূর্ব সময়ে এমন একটি সহিংস ঘটনা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য যে বড় ধরনের হুমকি, তা এখন অনেকের কাছেই স্পষ্ট। ফলে এই ঘটনার বিচার শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়, বরং রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সব মিলিয়ে, ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল শনাক্ত এবং মালিক গ্রেফতার হওয়ার বিষয়টি তদন্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দিয়েছে। একই সঙ্গে সন্দেহভাজন চালক ও হামলাকারীকে ঘিরে নতুন নতুন তথ্য সামনে আসায় পুরো ঘটনাটি এখন দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রে। তদন্তের পরবর্তী ধাপে কী বেরিয়ে আসে, সেটির দিকেই এখন সবার নজর।