প্রবল বর্ষণে বলিভিয়ায় ভয়াবহ বন্যায় প্রাণহানি ও নিখোঁজ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ২৫ বার

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

বলিভিয়ায় ভয়াবহ বন্যা দেশটির পূর্বাঞ্চলের সান্তা ক্রুজ বিভাগে মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরেছে, যেখানে প্রবল বর্ষণের ফলে নদী উপচে পড়ে প্রাণহানি, নিখোঁজের ঘটনা ও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে।

দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটিতে শুক্রবার রাত থেকে শুরু হওয়া টানা ভারী বর্ষণ সান্তা ক্রুজ বিভাগের পাইরাই নদীর পানি বিপৎসীমার অনেক ওপরে নিয়ে যায়। নদীর দুই তীর উপচে পানি ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায়। এর ফলে এল টর্নো শহরসহ পার্শ্ববর্তী একাধিক জনপদ হঠাৎ করেই পানিতে ডুবে যায়। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও কৃষিজমি তলিয়ে গিয়ে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, এই বন্যায় এখন পর্যন্ত অন্তত সাতজনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। এছাড়া নিখোঁজ রয়েছেন কমপক্ষে ২০ জন, যাদের সন্ধানে উদ্ধারকর্মীরা নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসনের আশঙ্কা, নদীর স্রোত ও পানির গভীরতা বাড়তে থাকায় নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

বন্যার তীব্রতায় সরকারি বিভিন্ন স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। জরুরি চিকিৎসাসেবাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হঠাৎ করেই রাতের আঁধারে পানি বাড়তে শুরু করলে বহু মানুষ ঘর ছাড়ার সুযোগ পাননি। অনেক পরিবার অল্প কিছু কাপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়েই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বের হয়ে পড়েন। কেউ কেউ আবার ছাদের ওপর কিংবা উঁচু গাছে উঠে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। বন্যার পানিতে আটকে পড়েছে গবাদিপশু ও কৃষিজমি, যার ফলে কৃষিনির্ভর মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্যোগে অন্তত ৬০০ পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শতাধিক মানুষ এখনও পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। উদ্ধারকারী দল নৌকা ও বিশেষ যান ব্যবহার করে দুর্গত এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। তবে প্রবল স্রোত ও ভাঙা সড়কের কারণে উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে।

বন্যার ফলে পরিবেশের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। বহু গাছপালা উপড়ে গেছে, নদীর তীর ভেঙে পড়েছে এবং বিস্তীর্ণ এলাকা কাদায় পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, পানি সরে যাওয়ার পর পানিবাহিত রোগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিলে শিশু ও বয়স্কদের জন্য পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ সরাসরি সংকট ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হয়েছেন। বন্যার ভয়াবহতা বিবেচনায় তিনি সরকারি প্রাসাদে একটি বিশেষ সংকট কেন্দ্র স্থাপন করেছেন এবং সেখান থেকেই পরিস্থিতি তদারকি করছেন। প্রেসিডেন্ট কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দিতে সেনাবাহিনী, জরুরি সেবা বিভাগ ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোকে একযোগে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সরকার ইতোমধ্যে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে, যেখানে বন্যাদুর্গত পরিবারগুলোকে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সহায়তার পরিমাণ এখনও প্রয়োজনের তুলনায় কম। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জরুরি সহায়তা পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বলিভিয়াসহ দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশেই চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়িয়ে তুলছে। অতিবৃষ্টি, হঠাৎ বন্যা ও ভূমিধসের মতো দুর্যোগ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘন ঘন ঘটছে। এই প্রেক্ষাপটে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা জোরদার করা এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি হয়ে উঠেছে।

বলিভিয়ায় ভয়াবহ বন্যা শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যৎকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে, তবে দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই মানবিক সংকট মোকাবিলায় কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত