বাংলাদেশ সীমান্তের ৮০ শতাংশে কাঁটাতারের বেড়া দিলো ভারত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১৫ বার

প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করেছে ভারত—এই তথ্য নতুন করে আলোচনায় এনেছে দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্ত রাজনীতি, নিরাপত্তা ও মানবিক বাস্তবতাকে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমান্তের প্রায় ৮০ শতাংশ অংশে ইতোমধ্যে কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। দিল্লির দাবি, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ রোধের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার ভারতের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় এক লিখিত উত্তরে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্য প্রকাশ করে। ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত-পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সীমান্তের ৯৩ শতাংশের বেশি এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের মোট ২ হাজার ২৮৯ দশমিক ৬৬ কিলোমিটারের মধ্যে ২ হাজার ১৩৫ দশমিক ১৩৬ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বেড়া দেওয়া হয়েছে, যা শতকরা ৯৩ দশমিক ২৫ ভাগ।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের আন্তর্জাতিক সীমান্ত প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ স্থলসীমান্ত। এই সীমান্ত ভারতের পাঁচটি রাজ্য—পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামের সঙ্গে যুক্ত। সীমান্তের বড় একটি অংশ নদী, পাহাড়, চর ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় পুরো সীমান্তে একযোগে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ দীর্ঘদিন ধরেই জটিলতা তৈরি করে আসছে। তবুও ভারত দাবি করছে, ধাপে ধাপে তারা নিরাপত্তা অবকাঠামো শক্তিশালী করছে।

ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্ত এলাকায় অবৈধ অনুপ্রবেশ, মানবপাচার, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান ঠেকাতেই এই বেড়া নির্মাণ করা হচ্ছে। দিল্লির ভাষ্য, সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে কাঁটাতারের বেড়া, আলোকসজ্জা, সেন্সর ও টহল ব্যবস্থাকে একত্রে কার্যকর করা হচ্ছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এই ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে।

তবে বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ বরাবরই সংবেদনশীল ইস্যু। সীমান্তের দুই পাশে বসবাসকারী মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কৃষিকাজ, যাতায়াত ও পারিবারিক যোগাযোগ এই বেড়ার কারণে বিঘ্নিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক এলাকায় সীমান্তরেখা গ্রাম ও কৃষিজমির মধ্য দিয়ে চলে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঠে যেতে কিংবা স্বাভাবিক চলাচল করতেও বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, কাঁটাতারের বেড়া ও কড়াকড়ি নিরাপত্তার ফলে সীমান্তে হতাহতের ঘটনাও বেড়েছে। অতীতে সীমান্তে গুলি, নির্যাতন ও প্রাণহানির ঘটনায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও একাধিকবার উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। যদিও দুই দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, বাস্তবে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হলেও এটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য কেবল নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং এটি মানবিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও জড়িত। সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সংযুক্ত। হঠাৎ করে কঠোর বেড়া ও নিয়ন্ত্রণ তাদের জীবনে বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশ সরকার অতীতে একাধিকবার সীমান্তে আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তির আলোকে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ ওঠে। ভারতের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হয়, কাঁটাতারের বেড়া মূল সীমান্ত রেখা থেকে নির্ধারিত দূরত্ব বজায় রেখেই নির্মাণ করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে যেখানে প্রায় পুরো অংশেই কাঁটাতারের বেড়া সম্পন্ন, সেখানে বাংলাদেশ সীমান্তে ৮০ শতাংশ বেড়া দেওয়া হলেও বাকি অংশগুলো সবচেয়ে জটিল ও সংবেদনশীল। নদী ও পাহাড়ি সীমান্তে এই বেড়া নির্মাণ প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক উভয় দিক থেকেই কঠিন। ফলে ভবিষ্যতে এই কাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে আরও বিতর্ক ও আলোচনার সৃষ্টি হতে পারে।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে, সীমান্তে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি মানবিক আচরণ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর কথা যখন নিয়মিত উচ্চারিত হচ্ছে, তখন সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নতুন করে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত