প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের সাবেক সেনা কর্মকর্তা কর্নেল (অব.) অজয় কে রায়নার একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের অনলাইন পরিসরে তীব্র আলোচনা, উদ্বেগ এবং সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ওসমান হাদির ওপর সাম্প্রতিক হামলার প্রেক্ষাপটে তার এই মন্তব্যকে অনেকেই শুধু দায়িত্বজ্ঞানহীন নয়, বরং সরাসরি হুমকি হিসেবেও দেখছেন। বিশেষ করে টুইটে তিনি হাদির পর ‘পরবর্তী টার্গেট’ হিসেবে হাসনাত আব্দুল্লাহর নাম উল্লেখ করায় বিষয়টি আরও সংবেদনশীল রূপ নিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া ওই পোস্টে কর্নেল (অব.) রায়না শুধু একটি নাম উল্লেখেই থেমে থাকেননি, বরং কীভাবে আঘাত করা উচিত, সে সম্পর্কেও মন্তব্য করেন। কোথায় গুলি করা দরকার, কীভাবে কাউকে ‘নিশ্চুপ’ করা হবে—এমন ভাষা ব্যবহার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। অনেক ব্যবহারকারী এটিকে সরাসরি হত্যার উসকানি হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ এটিকে মানসিকভাবে উসকানিমূলক ও অস্থিতিশীল বক্তব্য বলে আখ্যা দিয়েছেন।

এই পোস্ট ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রভাবশালী মিডিয়া হ্যান্ডলার, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বিষয়টি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছেন। তাদের মতে, একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে পরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য শুধু অনভিপ্রেতই নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকিস্বরূপ। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এটি নিছক ব্যক্তিগত মতামত, নাকি এর পেছনে আরও বড় কোনো রাজনৈতিক বা কৌশলগত বার্তা রয়েছে।
ওসমান হাদির ওপর সাম্প্রতিক হামলার ঘটনা এই বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। হাদির ওপর হামলার পর থেকেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়েছে। ঠিক এই সময়ে একজন ভারতীয় সাবেক সামরিক কর্মকর্তার এমন মন্তব্যকে অনেকে কাকতালীয় বলে মানতে নারাজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু ব্যবহারকারী প্রশ্ন তুলছেন, এই বক্তব্য কি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার ইঙ্গিত বহন করে, নাকি এটি নিছক উসকানিমূলক ভাষ্য।
ভারতের সাবেক সেনা কর্মকর্তা হিসেবে কর্নেল (অব.) অজয় কে রায়নার পরিচিতি কম নয়। তিনি নিজেকে একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে তুলে ধরেন এবং প্রায় ৩০টি বইয়ের লেখক হিসেবেও পরিচিত। নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতি নিয়ে তার লেখালেখি ভারতীয় পাঠকমহলে পরিচিত হলেও, এই প্রথম নয় যে তার মন্তব্য বিতর্কের জন্ম দিল। তবে এবারের মন্তব্যের ভাষা ও প্রেক্ষাপট আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশের অনলাইন পরিসরে অনেকেই এই বক্তব্যকে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। তাদের মতে, সীমান্ত, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এমনিতেই নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই ধরনের মন্তব্য সেই চ্যালেঞ্জকে আরও ঘনীভূত করতে পারে। বিশেষ করে যখন বক্তব্যটি একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার কাছ থেকে আসে, তখন সেটি সহজে উপেক্ষা করার সুযোগ থাকে না।
বিতর্ক ছড়িয়ে পড়লেও কর্নেল (অব.) অজয় কে রায়না পরে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা দুঃখপ্রকাশ করেননি। বরং একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বিষয়টিকে হালকাভাবে নেন এবং বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট নিয়ে অতিরিক্ত সংবেদনশীল হওয়ার প্রয়োজন নেই। তার মতে, এ ধরনের প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে শান্ত করার বদলে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, বাংলাদেশের উচিত ভারতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে ‘বাড়াবাড়ি’ না করা।
এই বক্তব্য নতুন করে ক্ষোভের জন্ম দেয়। সমালোচকরা বলছেন, একটি হুমকিমূলক বক্তব্যকে তুচ্ছ করে দেখানো দায়িত্বজ্ঞানহীনতারই বহিঃপ্রকাশ। তারা মনে করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির একটি পোস্টও বাস্তব জগতে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যখন তা সহিংসতার ইঙ্গিত দেয়, তখন সেটিকে ‘অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া বিপজ্জনক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ঘটনা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। কেউ কেউ সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন, বিষয়টি কূটনৈতিকভাবে নজরে আনার জন্য। আবার কেউ বলছেন, এটি মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি উসকানিমূলক বক্তব্য, যা অতিরিক্ত গুরুত্ব দিলে উল্টো উদ্দেশ্য সফল হতে পারে। তবে অধিকাংশ বিশ্লেষকই একমত যে, এ ধরনের বক্তব্য নজরদারির বাইরে রাখা যায় না।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকা জরুরি, কিন্তু সেই স্বাধীনতার নামে সহিংসতার উসকানি গ্রহণযোগ্য নয়। তারা মনে করছেন, দক্ষিণ এশিয়ার মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে দায়িত্বশীল ভাষা ব্যবহার করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি টুইট যে কেবল ভার্চুয়াল পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং বাস্তব জীবনের নিরাপত্তা ও রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে, সেটি এই ঘটনায় আবারও স্পষ্ট হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের বক্তব্য দুই দেশের জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়াতে পারে। রাষ্ট্রীয়ভাবে ভারত সরকার এ মন্তব্যের সঙ্গে যুক্ত না হলেও, একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তার কথাকে অনেকেই রাষ্ট্রীয় মানসিকতার প্রতিফলন হিসেবে দেখার চেষ্টা করেন। এতে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।
সব মিলিয়ে কর্নেল (অব.) অজয় কে রায়নার টুইট শুধু একটি ব্যক্তিগত পোস্টে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক উদ্বেগ, নিরাপত্তা প্রশ্ন এবং আঞ্চলিক সম্পর্কের জটিলতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে। হাদির ওপর হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই এমন মন্তব্য নতুন করে আতঙ্ক ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল আচরণ, সংযত ভাষা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রয়োজনীয়তা আরও একবার সামনে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, এই বিতর্ক ভবিষ্যতে কোন পথে গড়ায় এবং সংশ্লিষ্ট মহল কীভাবে এর মোকাবিলা করে।