১১ ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তি, তবু অনিশ্চয়তায় বন্দিজীবনের গল্প

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৪২ বার
১১ ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তি, তবু অনিশ্চয়তায় বন্দিজীবনের গল্প

প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ গাজার একটি সীমান্ত ক্রসিং দিয়ে ১১ জন ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। কয়েক মাস ধরে আটক থাকার পর এই মুক্তির খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই স্বস্তি, উদ্বেগ এবং প্রশ্ন—সবকিছু মিলিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বন্দি বিষয়ক ফিলিস্তিনি তথ্য অফিসের বিবৃতির বরাতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড জানায়, মুক্তিপ্রাপ্তদের শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি দেইর আল বালাহের আল-আকসা শহীদ হাসপাতালে নিয়ে গেছে।

মুক্তির এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন গাজা উপত্যকা দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চলমান সংঘাত, অবরোধ, খাদ্য ও ওষুধের সংকট এবং প্রতিনিয়ত সহিংসতার আশঙ্কা সাধারণ মানুষের জীবনকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। এই বাস্তবতায় ১১ জন বন্দির মুক্তি নিঃসন্দেহে তাদের পরিবার ও স্বজনদের জন্য স্বস্তির খবর হলেও, বৃহত্তর চিত্রে এটি ফিলিস্তিনি বন্দিদের সামগ্রিক পরিস্থিতির একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।

ফিলিস্তিনি বন্দি বিষয়ক তথ্য অফিসের বিবৃতিতে বলা হয়, মুক্তির পরপরই বন্দিদের আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির তত্ত্বাবধানে নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘ সময় আটক থাকার ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার প্রাথমিক মূল্যায়ন করা। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা। কারণ এর আগেও যেসব বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, তাদের অনেকের শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন, চরম অপুষ্টি এবং গুরুতর আঘাতের লক্ষণ পাওয়া গেছে বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন দাবি করেছে।

মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দিদের অনেকেই আগের অভিজ্ঞতায় জানিয়েছেন, আটক অবস্থায় তারা নিয়মিত নির্যাতন, পর্যাপ্ত খাবারের অভাব এবং চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। যদিও ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং দাবি করছে যে, আটক কেন্দ্রগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে পরিচালিত হয়, তবু ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।

এই মুক্তির ঘটনা হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি ও বন্দি বিনিময় চুক্তির প্রেক্ষাপটে দেখা হচ্ছে। গত ১৩ অক্টোবর থেকে এই চুক্তির আওতায় ইসরাইল ধাপে ধাপে ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি দিতে শুরু করে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে প্রায় এক হাজার ৭০০ জনকে গাজা উপত্যকা থেকে আটক করা হয়েছিল। এই বন্দিদের অনেকেই কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই দীর্ঘদিন আটক ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ফিলিস্তিনি সমাজে বন্দিদের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আবেগঘন। প্রায় প্রতিটি পরিবারই কোনো না কোনোভাবে আটক, গ্রেপ্তার বা নিখোঁজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িত। মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দিরা যখন ঘরে ফেরেন, তখন সেটি শুধু একটি ব্যক্তিগত ঘটনা নয়, বরং পুরো সম্প্রদায়ের জন্য এক ধরনের প্রতীকী মুহূর্ত হয়ে ওঠে। তবু সেই আনন্দের মাঝেও ভয় ও অনিশ্চয়তা রয়ে যায়—কারণ অনেক বন্দিই গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ট্রমা নিয়ে ফিরে আসেন, যা থেকে সুস্থ হয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগে।

ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নারী ও শিশুসহ ১০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি ইসরাইলি কারাগার ও আটক কেন্দ্রে বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই প্রশাসনিক আটক আইনের আওতায় রয়েছেন, যেখানে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর আটক রাখা সম্ভব হয়। এই ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে আসছে বিভিন্ন সংস্থা।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানায়, বন্দিরা নিয়মিত নির্যাতন, অনাহার এবং চিকিৎসা অবহেলার সম্মুখীন হচ্ছেন। পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়ায় এবং আটক অবস্থার কঠোরতার কারণে অসংখ্য বন্দির মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এসব অভিযোগ আন্তর্জাতিক পরিসরে বারবার আলোচিত হলেও কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান এখনো অধরাই রয়ে গেছে।

ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলে আসছে, নিরাপত্তাজনিত কারণেই এসব গ্রেপ্তার ও আটক প্রয়োজনীয়। তাদের দাবি, সন্ত্রাসী কার্যক্রম প্রতিরোধ এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে মানবাধিকার কর্মীরা মনে করেন, নিরাপত্তার অজুহাতে সমষ্টিগত শাস্তি আরোপ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং এতে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।

১১ বন্দির মুক্তির খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই এটিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন, আবার অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন—এত বন্দির ভিড়ে মাত্র কয়েকজনের মুক্তি কি সত্যিই মানবিক সংকট লাঘব করতে পারে? অনেকে মনে করছেন, এটি মূল সমস্যার সাময়িক উপশম মাত্র, স্থায়ী সমাধান নয়।

এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বারবার বন্দিদের মানবিক অধিকার রক্ষার আহ্বান জানালেও বাস্তব পরিস্থিতিতে তার প্রতিফলন খুব সীমিত বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যুদ্ধবিরতি ও বন্দি বিনিময়ের উদ্যোগগুলো সাময়িক স্বস্তি দিলেও, দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এখনো অনুত্তরিত।

সব মিলিয়ে, ১১ ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তি একটি মানবিক ঘটনার স্মরণ করিয়ে দেয়—যেখানে প্রতিটি সংখ্যা আসলে একটি জীবনের গল্প, একটি পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার প্রতিচ্ছবি। মুক্তির এই মুহূর্ত আনন্দের হলেও, হাজারো বন্দির ভাগ্য এখনো অজানা। ফিলিস্তিন সংকটের এই অধ্যায় তাই শুধু বন্দিমুক্তির খবরেই শেষ হয় না, বরং মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও স্থায়ী শান্তির প্রশ্নগুলোকে আরও গভীরভাবে সামনে এনে দেয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত