শক্তিশালী সৌরঝড় পৃথিবীতে আঘাত হানার আশঙ্কা বাড়ছে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১৩ বার

প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

শক্তিশালী সৌরঝড় পৃথিবীতে আঘাত হানতে পারে—এমন আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানী ও মহাকাশ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সূর্যের পৃষ্ঠ থেকে নির্গত প্রবল শক্তিশালী বিকিরণ ও চার্জিত কণার বিস্ফোরণের ফলেই সৌরঝড়ের সৃষ্টি হয়। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, সূর্য বর্তমানে তার সর্বোচ্চ সক্রিয়তার পর্যায়ে অবস্থান করছে, যাকে বলা হয় ‘সোলার ম্যাক্সিমাম’। এই পর্যায়ে সূর্য থেকে যে কোনো সময় শক্তিশালী করোনাল মাস ইজেকশন বা ভূচুম্বকীয় ঝড় ছুটে আসতে পারে, যা সরাসরি পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইট ও প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামোর ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে সক্ষম।

বিজ্ঞানীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌরঝড় মূলত সূর্যের চৌম্বকক্ষেত্রের হঠাৎ পরিবর্তনের ফল। সূর্যের ভেতরে জমে থাকা বিপুল শক্তি যখন একযোগে মুক্ত হয়, তখন তা মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে প্লাজমা ও চার্জিত কণার ঢেউ হিসেবে। এই কণাগুলো যখন পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রে আঘাত হানে, তখন ভূচুম্বকীয় ঝড়ের সৃষ্টি হয়। মাঝারি মাত্রার সৌরঝড় সাধারণত মেরু অঞ্চলে অরোরা বা মেরুজ্যোতি তৈরি করলেও শক্তিশালী সৌরঝড় বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি খুব শক্তিশালী সৌরঝড় পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে, তাহলে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে থাকা কৃত্রিম উপগ্রহগুলোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বিকল হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে এই নিম্ন কক্ষপথে হাজার হাজার স্যাটেলাইট ঘুরছে, যার মধ্যে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্পেসএক্সের স্টারলিংক নেটওয়ার্ক অন্যতম। এসব স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সংযোগ, জিপিএস ন্যাভিগেশন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু সৌরঝড়ের তীব্রতায় যদি স্যাটেলাইটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়, তাহলে একটির সঙ্গে আরেকটির সংঘর্ষের ঝুঁকি ভয়াবহভাবে বেড়ে যাবে।

বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে, কোনো বড় সৌরঝড়ের কারণে যদি স্যাটেলাইট অপারেটররা নিয়ন্ত্রণ হারান, তাহলে মাত্র ২ দশমিক ৮ দিনের মধ্যেই কক্ষপথে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এমনকি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা মাত্র ২৪ ঘণ্টা অচল থাকলেও বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এর অর্থ হলো, অল্প সময়ের মধ্যেই কক্ষপথে একাধিক স্যাটেলাইট একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলবে।

এই ধরনের ধারাবাহিক সংঘর্ষ শুরু হলে মহাকাশ বিজ্ঞানে পরিচিত ‘কেসলার সিনড্রোম’ দেখা দিতে পারে। কেসলার সিনড্রোম হলো এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে একটি স্যাটেলাইট ধ্বংস হলে তার ধ্বংসাবশেষ অন্য স্যাটেলাইটে আঘাত করে, সেগুলোকেও ভেঙে ফেলে এবং ধ্বংসের এই শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া ক্রমাগত চলতে থাকে। এর ফলে পৃথিবীর কক্ষপথ বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষে ভরে যায়, যা বহু বছর甚至 কয়েক দশক ধরে কক্ষপথকে ব্যবহার অনুপযোগী করে তুলতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শক্তিশালী সৌরঝড়ের প্রভাব শুধু মহাকাশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে পৃথিবীর দৈনন্দিন জীবনে। জিপিএস ব্যবস্থা বিকল হলে বিমান চলাচল, নৌপরিবহন ও সামরিক কার্যক্রমে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কে বিঘ্ন ঘটলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা, অনলাইন লেনদেন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং জরুরি সেবাগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস ব্যবস্থায় সমস্যা হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলাও কঠিন হয়ে উঠবে।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, সৌরঝড়ের ক্ষতিকর প্রভাব নতুন কিছু নয়। ১৮৫৯ সালের ‘ক্যারিংটন ইভেন্ট’ নামে পরিচিত এক শক্তিশালী সৌরঝড়ে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। সেই সময় আধুনিক স্যাটেলাইট বা বৈদ্যুতিক অবকাঠামো না থাকলেও, আজকের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে একই ধরনের সৌরঝড় আঘাত হানলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বর্তমানে বিভিন্ন মহাকাশ সংস্থা সূর্যের কার্যকলাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সৌরঝড়ের আগাম সতর্কতা দিতে বিশেষ স্যাটেলাইট ও টেলিস্কোপ ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে অপারেটররা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন। তবে বিজ্ঞানীরা স্বীকার করছেন, সবচেয়ে শক্তিশালী সৌরঝড়ের ক্ষেত্রে আগাম প্রস্তুতিও সব সময় পর্যাপ্ত নাও হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এমন ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা জরুরি। স্যাটেলাইটের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, কক্ষপথ ব্যবস্থাপনায় কঠোর নিয়ম এবং সৌরঝড় প্রতিরোধে উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবন ছাড়া এই সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হবে। শক্তিশালী সৌরঝড় পৃথিবীতে আঘাত হানলে মানবসভ্যতার প্রযুক্তিনির্ভর জীবনব্যবস্থায় যে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে, তা এখনই গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার সময় বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত