ভেতরের সংকটে ইসরায়েল ভেঙে পড়ার মুখে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ২২ বার

প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

ইসরায়েল ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছে—এই বাস্তবতা এখন আর শুধু সমালোচক বা বিরোধীদের বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশটির রাজনৈতিক, সামরিক ও সামাজিক কাঠামোর ভেতরে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। বাইরে থেকে ইসরায়েলকে অনেকের চোখে এখনো মধ্যপ্রাচ্যের এক শক্তিশালী ও বিজয়ী রাষ্ট্র বলে মনে হতে পারে। একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ পরিচালনা করে তারা শত্রুপক্ষকে বড় ধরনের সামরিক ক্ষতি করেছে, পশ্চিমা বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সমর্থনও তারা দীর্ঘদিন ধরে পেয়ে এসেছে। কিন্তু এই বাহ্যিক শক্তির আড়ালে ইসরায়েলি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গভীর এক ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যে জোট ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে, তা গাজাকে ইসরায়েলের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাওয়ার পথে এগোচ্ছে। এই জোটে কাতার, মিসর, সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তিগুলো যুক্ত রয়েছে। একই সঙ্গে সিরিয়া ও লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা সীমিত করার জন্যও চাপ বাড়ছে। প্রকাশ্যে এসব উদ্যোগের বিরোধিতা করলেও বাস্তবে ইসরায়েল সরকার যে এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করেছে, তা অনেক বিশ্লেষকের কাছেই স্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হয়তো প্রকাশ্যে শক্ত অবস্থান দেখাতে চান, কিন্তু নীরবে তিনি বুঝে গেছেন—অবিরাম যুদ্ধ চালানোর চেয়ে যুদ্ধের হুমকি ধরে রাখাই তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য বেশি লাভজনক।

এর পেছনে বড় কারণ হলো, গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলের ঘোষিত লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়নি। হামাসকে পুরোপুরি ধ্বংস করা যায়নি, আর জিম্মিদের জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিও পূরণ হয়নি। বরং বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ইসরায়েলি হামলায় নিহত জিম্মির সংখ্যা আগের ধারণার চেয়েও বেশি হতে পারে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে যে নিঃশর্ত সমর্থন ইসরায়েল দীর্ঘদিন ভোগ করে এসেছে, তা এখন ধীরে ধীরে ক্ষয় হচ্ছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কও আগের মতো উষ্ণ নেই।

দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমা কৌশলবিদদের কাছে মুসলিম ব্রাদারহুড বা ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হতো। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই ধারণা বদলাচ্ছে। অনেক পশ্চিমা নেতা প্রকাশ্যে স্বীকার করতে না পারলেও নীরবে মেনে নিচ্ছেন যে, ইসরায়েল নিজেই এখন মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার একটি বড় উৎসে পরিণত হয়েছে। সরাসরি সমালোচনা বা প্রকাশ্য চাপ দেওয়ার বদলে তারা ধীরে ও কৌশলে ইসরায়েলের ক্ষমতার হাতলগুলো আলগা করে দিচ্ছেন। এতে একদিকে ইসরায়েলি নেতৃত্ব প্রকাশ্যে অপমানিত হচ্ছে না, অন্যদিকে দেশটিকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাধ্য করা যাচ্ছে।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন বা ইরানে আগ্রাসী সামরিক অভিযান চালাতে ইসরায়েলের যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন, তা আর আগের মতো সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে আসছে। কৌশলগত বিস্তার বা দীর্ঘমেয়াদি দখলের বদলে এখন ইসরায়েলি সেনাবাহিনী মূলত নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক অভিযানে মনোযোগ দিচ্ছে—যাদের অতীতে ইসরায়েলিদের ওপর হামলার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে, তাদের খুঁজে বের করাই যেন এখন প্রধান কাজ। অনেক বিশ্লেষকের মতে, নতুন এই বাস্তবতায় এটাই ইসরায়েলের সর্বোচ্চ সামর্থ্য।

কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও ইসরায়েল ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। হামাস যেখানে আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছে, সেখানে ইসরায়েল সরকার সময়ক্ষেপণের কৌশল নিচ্ছে। এই অবস্থায় গাজায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে চালানো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের দায়ভার শেষ পর্যন্ত কার ওপর পড়বে—সে প্রশ্নও জোরালো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলে এমন কথাও শোনা যাচ্ছে, ধ্বংসস্তূপ সরানো ও পুনর্গঠনের ব্যয় ইসরায়েলকেই বহন করতে হতে পারে।

একই সময়ে ইসরায়েলি সমাজ ভেতর থেকেও চরম চাপের মুখে পড়ছে। রাষ্ট্রের শক্তি ও সম্পদ ব্যয় হচ্ছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে, আত্মপরিচয়ের সংকটে এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ দখল আরও জোরদার করার চেষ্টায়। এর ফলে ইসরায়েলিরা ক্রমেই নিজেদের সীমানার বাইরে কোনো জগতের অস্তিত্বে বিশ্বাস হারাচ্ছে।

এই ভাঙনের প্রতীক হয়ে উঠেছে ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর সাম্প্রতিক কেলেঙ্কারি। দীর্ঘ প্রশিক্ষণ শেষে প্রায় স্নাতক হতে যাওয়া যুদ্ধবিমান ক্যাডেটদের একটি অনুশীলন ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আসলে অনেক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। বন্দিত্বের কঠিন প্রশিক্ষণের পর একটি গোপন স্থানে তাদের বিশ্রামে পাঠানো হয়, যেখানে শৃঙ্খলাভঙ্গ ও মদ্যপানের অভিযোগ ওঠে। বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব এটিকে নৈতিক অবক্ষয়ের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে কঠোর অবস্থান নেয়। কিন্তু দেশটির গণমাধ্যম ও সমাজে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে আরও বড় প্রশ্ন—এই ক্যাডেটরা আসলে কার প্রতিনিধিত্ব করছে।

তাদের অনেককে পুরোনো ইসরায়েলি অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যাদের নৈতিক দেউলিয়াপনা ও দিশাহীনতা স্পষ্ট। বিপরীতে, গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ চালানো নতুন এক শ্রেণিকে ‘ইসরায়েলের জনগণ’-এর নামে আত্মত্যাগকারী হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এই বিভাজন ইসরায়েলি সমাজের গভীর裂裂কে প্রকাশ করে। একদিকে পাইলটদের একটি অংশ সরকার ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা দিয়ে বলছে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার যত দিন নির্দেশ দেবে, তত দিন তারা গাজায় অভিযান চালিয়ে যাবে। অথচ এই একই সরকারবিরোধী আন্দোলনে তারাই অতীতে বহুবার রাস্তায় নেমেছে।

গাজায় চালানো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের বড় দায় যাদের ওপর পড়ে, সেই বিমানবাহিনীই এখন নৈতিকতার কথা বলছে—এতে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের নৈতিক সংকট আরও স্পষ্ট হয়। বেসামরিক ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোয় নির্বিচার বোমাবর্ষণ বিশ্ববাসীকে স্তব্ধ করেছে এবং ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনীর নৈতিকতার শেষ দাবিটুকুও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

এই সবকিছুর পাশাপাশি ইসরায়েলের অভ্যন্তরে সামাজিক সংকটও তীব্র হচ্ছে। টিকা না পাওয়া শিশুরা রোগে মারা যাচ্ছে, কিশোর গ্যাং ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের ওপর হামলা চালাচ্ছে, আর ইসরায়েলের ভেতরের ফিলিস্তিনি নাগরিকরা অপরাধী চক্রের গোলাগুলিতে প্রাণ হারাচ্ছেন। গাজা যুদ্ধ থেকে ফেরা সাবেক সেনাদের মধ্যে আত্মহত্যার হার নজিরবিহীনভাবে বাড়ছে।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত