প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
সুদানে আরএসএফের হামলা আবারও দেশটির চলমান গৃহযুদ্ধের ভয়াবহ মানবিক চিত্র সামনে নিয়ে এসেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দক্ষিণ কর্দোফানের ডিলিং শহরের আবাসিক এলাকায় র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস ও তাদের মিত্রদের টানা গোলাবর্ষণে কমপক্ষে ১৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের উপস্থিতি এই সংঘাতের নিষ্ঠুরতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। চিকিৎসক সংগঠন সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক এই তথ্য নিশ্চিত করে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত দুই দিন ধরে ডিলিং শহরের ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় আরএসএফ ও তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নির্বিচারে গোলাবর্ষণ চালাচ্ছে। বাড়িঘর, দোকানপাট ও আশ্রয়কেন্দ্র লক্ষ্য করে চালানো এই হামলায় সাধারণ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন এবং বহু মানুষ গুরুতর আহত হচ্ছেন। যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নিহত ১৬ জনের মধ্যে কয়েকজন শিশু ছিল, যাদের বয়স ছিল মাত্র কয়েক বছর। এছাড়া নারী ও বৃদ্ধদের মৃত্যুর ঘটনাও নিশ্চিত করা হয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, বেসামরিক এলাকাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও যুদ্ধবিধির সরাসরি লঙ্ঘন। তারা অবিলম্বে এই হামলা বন্ধের দাবি জানিয়েছে।
কর্দোফান অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই সুদানের সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্র। বিশেষ করে ডিসেম্বরের শুরু থেকে এই অঞ্চলে সহিংসতার মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্কের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কর্দোফানে ১০০ জনেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যার মধ্যে ডিলিং শহরের সাম্প্রতিক হতাহতের ঘটনাই শুধু নয়, আশপাশের অন্যান্য এলাকাতেও সংঘর্ষে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
এই সহিংসতার ফলে মানবিক সংকটও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাস থেকে কর্দোফানের তিনটি রাজ্য থেকে সহিংসতা এড়িয়ে পালিয়ে গেছেন ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। ঘরবাড়ি ছেড়ে এসব মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন প্রতিবেশী অঞ্চল কিংবা অস্থায়ী শিবিরে, যেখানে খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। শুধু ডিলিং শহর থেকেই এই সময়ের মধ্যে প্রায় ৭১০ জন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো বলছে, কর্দোফানে চলমান সংঘাতের কারণে ত্রাণ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সড়কপথ অনিরাপদ হয়ে পড়ায় এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দখলদারির কারণে দুর্গত এলাকায় সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। অপুষ্টি, রোগব্যাধি এবং চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর আশঙ্কা বাড়ছে।
সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে, যাতে তারা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে বেসামরিক এলাকায় হামলা বন্ধ করাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। একই সঙ্গে যুদ্ধে আটকে পড়া মানুষের কাছে দ্রুত ও নিরাপদভাবে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
এই সহিংসতার প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে গত ১৩ ডিসেম্বর দক্ষিণ কর্দোফানের রাজধানী কাদুগলিতে ড্রোন হামলায় ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত হওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ওই হামলাকে সরাসরি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে অভিহিত করেন এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশসহ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শান্তিরক্ষা মিশনের সদস্যরা যেখানে নিরপেক্ষভাবে বেসামরিক জনগণকে সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছেন, সেখানে তাদের ওপর হামলা আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা ব্যবস্থার জন্যও বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সুদানের গৃহযুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু সামরিক সংঘর্ষ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও ভেঙে পড়ছে। আরএসএফ ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। কর্দোফানের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই সহিংসতা আরও বেশি প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে, কারণ সেখানে আন্তর্জাতিক নজরদারি ও সহায়তা তুলনামূলকভাবে কম।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে, অবিলম্বে কার্যকর আন্তর্জাতিক উদ্যোগ না নেওয়া হলে কর্দোফানসহ সুদানের বিভিন্ন অঞ্চলে বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্ত না হলে দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হবে, যা ভবিষ্যতে সহিংসতা কমানোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।