সুইডেনে ইসরাইলবিরোধী বিক্ষোভে মুখর স্টকহোম

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৩ বার
সুইডেনে ইসরাইলবিরোধী বিক্ষোভে মুখর স্টকহোম

প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং ফিলিস্তিন ইস্যুকে ঘিরে ইউরোপজুড়ে যে প্রতিবাদ ও জনমত গড়ে উঠছে, তারই একটি শক্তিশালী প্রতিফলন দেখা গেছে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে। ইসরাইলের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন শত শত মানুষ। অধিকৃত পশ্চিম তীরকে ইসরাইলের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা এবং ঘোষিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি যথাযথভাবে অনুসরণে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ তুলে বিক্ষোভকারীরা তেলআবিবের তীব্র নিন্দা জানান। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটরসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম এই বিক্ষোভের খবর প্রকাশ করেছে।

শনিবার স্থানীয় সময় দুপুরের দিকে স্টকহোমের ওডেনপ্ল্যান স্কয়ারে জড়ো হন বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষ। মানবাধিকার কর্মী, শিক্ষার্থী, শান্তিকামী নাগরিক এবং ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠনের সদস্যদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে প্রতিবাদী কণ্ঠে মুখর। বিক্ষোভকারীরা ‘ফিলিস্তিনকে মুক্ত করো’, ‘খুনি ইসরাইল, ফিলিস্তিন থেকে বেরিয়ে যাও’ এবং ‘পশ্চিম তীরের অধিগ্রহণকে না’—এমন স্লোগান দিতে থাকেন। তাদের কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ, কিন্তু আচরণে ছিল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের দৃঢ়তা।

বিক্ষোভ শুরুর পর অংশগ্রহণকারীরা একটি মিছিল নিয়ে সুইডিশ পার্লামেন্ট ভবনের দিকে অগ্রসর হন। হাতে হাতে ছিল ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড, যেখানে লেখা ছিল ‘ইসরাইল যুদ্ধবিরতি মেনে চলছে না’ এবং ‘গণহত্যা বন্ধ করো’। অনেক ব্যানারে গাজা ও পশ্চিম তীরের ধ্বংসযজ্ঞের ছবি তুলে ধরা হয়, যা পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মিছিল চলাকালে পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হলেও কোথাও কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। পুরো কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হয়।

বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, ইসরাইল শুধু গাজায় সামরিক অভিযান চালিয়েই থেমে থাকেনি, বরং অধিকৃত পশ্চিম তীরকে স্থায়ীভাবে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করার যে পরিকল্পনা রয়েছে, তা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের প্রস্তাবনার সরাসরি লঙ্ঘন। তাদের মতে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও হামলা ও সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া প্রমাণ করে যে ইসরাইল সরকার শান্তি প্রক্রিয়ায় আন্তরিক নয়। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে বলে তারা মনে করেন।

মালিন আকেরস্ট্রম নামে এক বিক্ষোভকারী গণমাধ্যমকে বলেন, শীতের তীব্রতায় গাজায় মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হয়েছে। বিদ্যুৎ, পানি ও চিকিৎসাসেবার সংকটে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নারী ও শিশুরা চরম দুর্ভোগে পড়েছে। তিনি বলেন, এটি শুধু একটি রাজনৈতিক সংকট নয়, এটি একটি মানবিক বিপর্যয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। তার বক্তব্যে প্রতিফলিত হয় ইউরোপীয় সমাজের একটি অংশের গভীর উদ্বেগ ও মানবিক দায়বদ্ধতা।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেকেই বলেন, তারা ইসরাইলি জনগণের বিরুদ্ধে নন, বরং তারা ইসরাইল সরকারের নীতির বিরোধিতা করছেন। তাদের ভাষায়, সাধারণ মানুষ যুদ্ধ চায় না, কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে নিরীহ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এই বিক্ষোভের লক্ষ্য কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো নয়, বরং যুদ্ধ বন্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো।

এই বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে সুইডেনের রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির ১০০ জনেরও বেশি আইনপ্রণেতা এক যৌথ আহ্বানে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সহিংসতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় সুইডেনসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের আরও সক্রিয় ভূমিকা থাকা উচিত। আইনপ্রণেতাদের এই অবস্থান সুইডেনের রাজনীতিতে ফিলিস্তিন ইস্যুকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সুইডেন ঐতিহ্যগতভাবেই মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া দেশ হিসেবে পরিচিত। ফলে ফিলিস্তিন ইস্যুতে দেশটির জনগণ ও রাজনীতিকদের একটি বড় অংশের এমন অবস্থান অস্বাভাবিক নয়। ইউরোপের অন্যান্য দেশেও একই ধরনের বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে, যা ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতকে কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক ইস্যুতে পরিণত করেছে।

স্টকহোমের এই বিক্ষোভে অংশ নেওয়া তরুণদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়ভাবে তাদের অবস্থান তুলে ধরছেন। তারা বলছেন, প্রচলিত কূটনৈতিক ভাষা ও বিবৃতির বাইরে গিয়ে নাগরিকদের কণ্ঠ শোনা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, শান্তিপূর্ণভাবে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের চোখেমুখে উদ্বেগ ও প্রত্যাশার ছাপ। এই ডিজিটাল প্রচার বিক্ষোভের বার্তাকে সুইডেনের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে দিচ্ছে।

এদিকে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও পশ্চিম তীর ও গাজার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তারা বারবার যুদ্ধবিরতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, মানবিক সহায়তা নিশ্চিতকরণ এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। সুইডেনের বিক্ষোভকারীরা মনে করেন, এই দাবিগুলো বাস্তবায়নে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

স্টকহোমের ওডেনপ্ল্যান স্কয়ার থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ শুধু একটি দিনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ইউরোপীয় সমাজে চলমান এক দীর্ঘ প্রতিবাদী ধারার অংশ। এই ধারার মূল বক্তব্য হলো—যুদ্ধ নয়, শান্তি; দখল নয়, ন্যায়বিচার; নীরবতা নয়, মানবিক দায়িত্ব। সুইডেনের রাজপথে উচ্চারিত এই কণ্ঠস্বর আন্তর্জাতিক মহলের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে, যে বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ ফিলিস্তিন সংকটের একটি ন্যায়সংগত ও টেকসই সমাধান দেখতে চায়।

সার্বিকভাবে, সুইডেনে ইসরাইলবিরোধী এই বিক্ষোভ আবারও প্রমাণ করেছে যে ফিলিস্তিন ইস্যু শুধুমাত্র মধ্যপ্রাচ্যের সীমার মধ্যে আবদ্ধ নেই। এটি বিশ্ব বিবেকের প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। স্টকহোমের রাজপথে শান্তিপূর্ণভাবে জড়ো হওয়া মানুষের কণ্ঠে যে প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে, তা হয়তো অবিলম্বে নীতিগত পরিবর্তন আনবে না, তবে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন চাপ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত