প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে ইতোমধ্যেই স্বীকৃতি পেতে শুরু করেছে। এই অভ্যুত্থান ছিল কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন নয়; এটি ছিল দীর্ঘদিনের জমে ওঠা গণঅসন্তোষ, বঞ্চনা, বৈষম্য ও রাজনৈতিক দমননীতির বিরুদ্ধে জনগণের সম্মিলিত বিস্ফোরণ। এর কেন্দ্রে ছিল গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা—জনগণের শাসনের অধিকার পুনরুদ্ধারের দাবি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, গণতন্ত্র মানে জনগণের শাসন, কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সেই শাসন সরাসরি নয়, প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সেই প্রতিনিধিত্বের একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ নির্বাচন। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের জনগণ সেই মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল, যা শেষ পর্যন্ত ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানকে অনিবার্য করে তোলে।
বিশ্ব রাজনীতিতে ‘গণতন্ত্র’ শব্দটি এতটাই জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত যে, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—স্বৈরতন্ত্রও প্রায়ই নিজেকে গণতান্ত্রিক বলে আখ্যায়িত করেছে। পাকিস্তানের আইয়ুব খানের তথাকথিত ‘মৌলিক গণতন্ত্র’, শেখ মুজিবের ‘শোষিতের গণতন্ত্র’, এরশাদের ‘নয়া গণতন্ত্র’ কিংবা শেখ হাসিনার ‘উন্নয়নের গণতন্ত্র’—এসব বিশেষণযুক্ত গণতন্ত্র আসলে প্রকৃত গণতন্ত্রের বিকল্প ছিল না, বরং ক্ষমতা কুক্ষিগত করার কৌশলমাত্র। ইতিহাসের এই অভিজ্ঞতা থেকেই বাংলাদেশের জনগণের মনে একটি বোধ দৃঢ় হয়েছে—গণতন্ত্রের আগে বা পরে বিশেষণ যুক্ত হলেই সেখানে ভেজাল আছে। প্রকৃত গণতন্ত্র মানে অবাধ নির্বাচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং ক্ষমতার জবাবদিহি।
বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রের অনুশীলনে নতুন নয়। ব্রিটিশ কোম্পানি আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান যুগ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতন্ত্রের জন্য বারবার সংগ্রাম হয়েছে। ১৯৪৬, ১৯৫৪, ১৯৭০ এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনগুলো তার প্রমাণ। যখনই গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়েছে, তখনই মানুষ প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—সবকিছুই গণতন্ত্রের ধারাবাহিক সংগ্রামের মাইলফলক। এই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ এবং সবচেয়ে বিস্তৃত রূপই হলো ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান।
এই অভ্যুত্থানকে অনন্য করে তুলেছে এর ব্যাপ্তি ও চরিত্র। অতীতের কোনো আন্দোলনেই এত ব্যাপকভাবে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা যায়নি। এটি কেবল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছিল না; বরং শ্রমজীবী মানুষ, পেশাজীবী, কর্মজীবী নারী-পুরুষ, শহর ও গ্রামের সাধারণ মানুষ—সবাই এই আন্দোলনের অংশ হয়ে ওঠে। এর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল জেন-জি বা নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব। রাজনৈতিক দলীয় নেতৃত্বের বাইরে থেকেও যে একটি প্রজন্ম সংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও কৌশলগত আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে, ২০২৪ তার জ্বলন্ত উদাহরণ। এই প্রজন্ম বৈষম্যহীন সমাজ, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান এবং নাগরিক মর্যাদার যে স্বপ্ন দেখেছে, তা দেশের কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক অধ্যায়ে একটি মৌলিক সংযোজন। এর গতি, কৌশল ও ভাষা ছিল সম্পূর্ণ নতুন। ‘বাংলা ব্লকেড’, ‘কমপ্লিট শাটডাউন’, ‘মার্চ ফর জাস্টিস’-এর মতো ধারণা আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়। বিপরীতে, তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা না করে দমননীতি ও সহিংসতার পথ বেছে নেয়, যা শেষ পর্যন্ত তাদের পতনকে ত্বরান্বিত করে। ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা হলো—যখনই কোনো শাসক জনগণের বৈধ দাবিকে শক্তি দিয়ে দমন করতে চায়, তখন সেই শক্তিই একসময় তার জন্য বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মই হয়েছে গণতান্ত্রিক সংকট থেকে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়া হলে হয়তো স্বাধীনতার পথ ভিন্ন হতো। কিন্তু স্বাধীনতার পরও গণতন্ত্রের পথ মসৃণ হয়নি। একদলীয় শাসন, সামরিক শাসন এবং পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র—সবই বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বারবার বিপন্ন করেছে। বিশেষ করে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়কালে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। নির্বাচন ব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে ওঠে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দলীয়করণের শিকার হয় এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বাড়তে থাকে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও বাংলাদেশকে ‘নির্বাচনি স্বৈরতন্ত্র’ ও ‘কঠোর কর্তৃত্ববাদী’ রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটেই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এক ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দেয়। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জনগণের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মৌলিক সংস্কার। সংবিধান, ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন ব্যবস্থা, রাজনৈতিক দলের আচরণ, আমলাতন্ত্রের নিরপেক্ষতা—সবকিছুই নতুন করে ভাবার দাবি ওঠে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই প্রত্যাশার চাপে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়, যদিও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ ও বিতর্কও তৈরি হয়।
২৪-এর গণঅভ্যুত্থান শেষ কথা নয়; এটি একটি সূচনা। এর সফলতা নির্ভর করবে এই আন্দোলনের গণঅভিপ্রায় কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় তার ওপর। যদি এই অভ্যুত্থান থেকে উদ্ভূত সংস্কার উদ্যোগ ব্যর্থ হয়, তবে এটি কেবল আরেকটি ইতিহাসের অধ্যায় হয়ে থাকবে। আর যদি জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী গণতান্ত্রিক কাঠামো পুনর্গঠন করা যায়, তবে এটি বাংলাদেশকে একটি নতুন রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে।
সব মিলিয়ে, ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ছিল গণতন্ত্রের জন্য জনগণের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার বিস্ফোরণ। এটি নিছক ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং একটি নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক চুক্তির দাবি। এই অভ্যুত্থান বাংলাদেশকে একটি সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।