ইরানের স্কুলে হামলায় নিহত প্রায় ১৮০

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬
  • ৭২ বার
ইরানের স্কুলে হামলায় নিহত

প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের ভয়াবহতায় নতুন করে শোকের ছায়া নেমেছে ইরান জুড়ে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে ভয়াবহ হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৮০ জনে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। শনিবার চালানো ওই হামলার পর থেকে ধ্বংসস্তূপের ভেতর উদ্ধারকাজ চলতে থাকায় নিহতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, আর প্রতিটি নতুন সংখ্যা যেন দেশজুড়ে আরও গভীর শোকের ঢেউ ছড়িয়ে দিচ্ছে।

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ প্রধান হোসেইন কেরমানপুর জানিয়েছেন, মিনাবের ওই মেয়েদের স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ‘প্রায় ১৮০ শিশু’ নিহত হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন একই ধরনের ছিল যা কয়েক ঘণ্টা আগে রাজধানী তেহরান-এর একটি হাসপাতালে হামলার সময় ব্যবহার করা হয়েছিল। যদিও হাসপাতাল হামলার ঘটনাটিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি, তবু সরকারি এই বক্তব্য পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও উত্তেজনা কতটা তীব্র তা স্পষ্ট করে দিয়েছে।

ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে ইরানের রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, ধ্বংস হয়ে যাওয়া শ্রেণিকক্ষ, ছিন্নভিন্ন বই-খাতা এবং মাটিতে পড়ে থাকা স্কুলব্যাগ। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বিস্ফোরণের শব্দ ছিল এতটাই শক্তিশালী যে কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও তা অনুভূত হয়েছে। অনেক অভিভাবক স্কুলের ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে সন্তানদের খোঁজে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, অনেক শিশুর দেহ এতটাই ক্ষতবিক্ষত ছিল যে তা শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

ইরান সরকার দাবি করেছে, হামলাটি যৌথভাবে চালিয়েছে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটন বা তেল আবিব আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে উভয় পক্ষের তথ্যযুদ্ধও তীব্র হয়ে উঠেছে এবং প্রতিটি পক্ষ নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে তথ্য প্রচার করছে। ফলে প্রকৃত ঘটনার পূর্ণ চিত্র পাওয়া এখনো কঠিন হয়ে আছে।

স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার সময় স্কুলে ক্লাস চলছিল এবং অধিকাংশ শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত ছিল। বিস্ফোরণের পরপরই চারদিকে ধোঁয়া ও ধুলায় আকাশ ঢেকে যায়। আহতদের দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে অনেককে করিডোরে শুইয়ে চিকিৎসা দিতে হয়েছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, আহতদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

ঘটনার পর মিনাব শহর কার্যত শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছে। দোকানপাট বন্ধ, রাস্তাঘাট ফাঁকা, আর শহরের বিভিন্ন স্থানে কালো পতাকা টানানো হয়েছে। ধর্মীয় নেতারা মসজিদে বিশেষ দোয়ার আয়োজন করেছেন এবং নিহত শিশুদের জন্য জাতীয় শোক ঘোষণা করার দাবি উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা গেছে, স্থানীয়রা মোমবাতি জ্বালিয়ে নিহতদের স্মরণ করছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, যদি বেসামরিক স্থাপনায় হামলার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী স্কুল, হাসপাতাল বা অন্য বেসামরিক অবকাঠামো ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যদিও ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত এখনো শুরু হয়নি, তবু বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং প্রতিশোধমূলক হামলার চক্র সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করছে। বিশেষ করে শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে হামলা, সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত এবং পাল্টাপাল্টি হুমকি পরিস্থিতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যেখানে যে কোনো মুহূর্তে সংঘাত বড় আকার নিতে পারে। মিনাবের স্কুলে হামলার ঘটনা সেই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ইরানের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক দুই-ই বাড়ছে। অনেকেই মনে করছেন, দেশটি এখন সরাসরি যুদ্ধের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। সরকার জনগণকে সতর্ক থাকতে বলেছে এবং গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল বলছে, পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত না হলে তা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে। কারণ মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র, আর সেখানে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভারসাম্য পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের ওই অঞ্চলে ভ্রমণে সতর্কতা জারি করেছে।

শোকাহত পরিবারগুলোর কাছে অবশ্য এসব ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ অর্থহীন। তাদের কাছে সবচেয়ে বড় সত্য হলো, তারা তাদের সন্তানদের হারিয়েছেন। এক অভিভাবক স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সকালে মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর সময় তিনি কল্পনাও করতে পারেননি সেটিই হবে শেষ দেখা। তার কণ্ঠে ছিল অসহায়তা ও ক্ষোভ—যুদ্ধ যদি বড়দের মধ্যে হয়, তবে শিশুদের কেন মরতে হবে?

উদ্ধার অভিযান এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে সম্ভাব্য জীবিতদের খোঁজে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। একই সঙ্গে তদন্তকারীরা হামলার প্রকৃতি ও ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন বিশ্লেষণ করছেন। আন্তর্জাতিক মহল নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে, যাতে প্রকৃত সত্য উদঘাটন হয় এবং দায়ীদের চিহ্নিত করা যায়।

মিনাবের এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার প্রায়ই নিরীহ মানুষ, বিশেষ করে শিশু। রাজনীতি, কৌশল ও প্রতিশোধের হিসাবের আড়ালে হারিয়ে যায় মানবিকতা, আর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে অসংখ্য স্বপ্ন। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে তা এখনো অনিশ্চিত, তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—এই হামলার ক্ষত দীর্ঘদিন ধরে বয়ে বেড়াতে হবে ইরানের মানুষকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com