প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ ঘিরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বেতন ও মজুরি বাড়ানোসহ বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলনের প্রভাবে এক দিনে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোর ৫২৯টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিস্থিতি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এসব কারখানার প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার ১৯০ শ্রমিক কর্মস্থলে উপস্থিত হয়েও কাজ না করে অথবা কর্মস্থল ছেড়ে চলে গেছেন।
শ্রমিক অসন্তোষের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে গাজীপুর ও ময়মনসিংহ শিল্পাঞ্চলে। সেখানে ২৭৬টি কারখানার প্রায় ৬ লাখ ৪৫ হাজার ৩৬০ শ্রমিক কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন। সাভার, আশুলিয়া ও জিরানী এলাকায় ১৮৫টি কারখানার প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার ২০৫ শ্রমিক কাজে অংশ নেননি। রাজধানীর মিরপুর এলাকায়ও ৬৮টি কারখানার ৫১ হাজার ৬২৫ শ্রমিক কর্মস্থল ছেড়ে বেরিয়ে যান। সব মিলিয়ে এক দিনের এই অচলাবস্থা দেশের তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা ও রপ্তানি কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিজিএমইএর তথ্য বলছে, মিরপুর, গাজীপুর-ময়মনসিংহ এবং সাভার-আশুলিয়া এলাকায় সংগঠনটির আওতাধীন মোট ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে ওই দিন ১ হাজার ৮১৬টি কারখানা চালু ছিল। কিন্তু দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং সংঘর্ষের ঘটনা বাড়তে থাকায় একের পর এক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করতে হয়। অনেক শ্রমিক উৎপাদন শুরু না করেই কারখানা থেকে বেরিয়ে যান।
শ্রমিকদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, বকেয়া পাওনা পরিশোধ, চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহাল এবং কর্মস্থলে কালো তালিকাভুক্তির মতো অভিযোগের অবসান। বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে বাড়িভাড়া, খাদ্যপণ্য, যাতায়াত, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, বর্তমান মজুরিতে পরিবার নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
একজন পোশাকশ্রমিকের জন্য এই আন্দোলনের বিষয়টি শুধু মজুরি বৃদ্ধির দাবি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রতিদিনের জীবনসংগ্রাম। মাসের শুরুতে বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, খাবার, যাতায়াত ও চিকিৎসার খরচ মেটানোর পর হাতে খুব সামান্য অর্থ অবশিষ্ট থাকে—এমন অভিযোগ বহু শ্রমিকের। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি পুনর্নির্ধারণের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই শ্রমিকদের মধ্যে জমে ছিল। সেই অসন্তোষই সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে প্রকাশ্য আন্দোলনের রূপ নিয়েছে।
তবে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির পাশাপাশি আন্দোলনের নামে সহিংসতা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সড়ক অবরোধের ঘটনায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। মিরপুর, গাজীপুরের কালিয়াকৈর, সাভার ও আশুলিয়াসহ কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ হয়েছে। কোথাও পুলিশি যানবাহনে আগুন দেওয়া হয়েছে, কোথাও কারখানা ও স্থাপনায় হামলার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনও বিপর্যস্ত হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে। গাজীপুরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণভাবে তাদের দাবি তুলে ধরার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সহিংসতা ও নাশকতার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
এই অস্থিরতার মধ্যেই সরকার পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। এতে মালিক ও শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধির পাশাপাশি একজন নিরপেক্ষ সদস্যও রাখা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ নিরপেক্ষ প্রতিনিধি হিসেবে বোর্ডে রয়েছেন।
সরকারের এই উদ্যোগকে শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রাতিষ্ঠানিক সমাধানের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, শ্রমিকদের দাবিকে গুরুত্ব দিয়েই মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। দ্রুত আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে উপযুক্ত মজুরি নির্ধারণের আশ্বাস দিয়ে তিনি শ্রমিকদের আন্দোলন পরিহার করে কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।
মজুরি বোর্ড গঠনের পরও অবশ্য সব শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। শ্রমিকদের একটি অংশ অবিলম্বে মজুরি বৃদ্ধির নিশ্চয়তা চাচ্ছেন। তাদের বক্তব্য, শুধু বোর্ড গঠন করলেই হবে না, আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবসম্মত মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। অন্যদিকে শিল্প মালিকরা বলছেন, মজুরি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তারা অস্বীকার করছেন না, তবে পোশাকশিল্পের বর্তমান উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতা এবং রপ্তানি পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে।
শিল্প মালিকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন রপ্তানি আদেশ ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা নিয়ে। বছরের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকলে সময়মতো পণ্য তৈরি ও জাহাজীকরণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছাতে না পারলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে অর্ডার অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোতে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক খাতের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন এবং দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে পোশাকপণ্য থেকে। ফলে কয়েক দিন ধরে চলা একটি শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতাও শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। কারখানা বন্ধ হলে শুধু মালিক বা শ্রমিকই ক্ষতিগ্রস্ত হন না; পরিবহন, কাঁচামাল সরবরাহ, বন্দর, ব্যাংকিং, প্যাকেজিংসহ সংশ্লিষ্ট অসংখ্য খাতও এর প্রভাবের মুখে পড়ে।
এ অবস্থায় শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি এবং শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা—দুই বিষয়কেই সমান গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের পথে এগোনোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন যেমন জরুরি, তেমনি সহিংসতা ও ভাঙচুর কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আনতে পারে না। একইভাবে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মাধ্যমে শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অসন্তোষও দূর করা সম্ভব নয়।
শ্রমিক, মালিক, সরকার এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর ও আস্থাভিত্তিক সংলাপ এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে। মজুরি বোর্ডকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও বাস্তবভিত্তিক প্রক্রিয়ায় কাজ করতে হবে। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়, পরিবারের প্রয়োজন এবং শিল্পের সক্ষমতা বিবেচনা করে এমন একটি মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে শ্রমিকরা সম্মানজনকভাবে জীবনযাপন করতে পারেন এবং শিল্পও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে পারে।
অন্যদিকে আন্দোলনের নামে সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা, কারখানায় হামলা কিংবা অগ্নিসংযোগ বন্ধ করাও জরুরি। কারণ শেষ পর্যন্ত শিল্প অচল হলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন সেই শ্রমিকরাই, যাদের জীবনমান উন্নয়নের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়েছে। একটি কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে শ্রমিকের আয় বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি পরিবারে খাদ্য, বাসাভাড়া ও চিকিৎসার ব্যয় মেটানোও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
সরকারের পক্ষ থেকে উৎপাদন ও রপ্তানি স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ কতটা নেওয়া যায়, সেটিই বড় প্রশ্ন। মজুরি বোর্ডের আলোচনায় যদি শ্রমিকদের প্রত্যাশা ও শিল্প মালিকদের বাস্তবতা—দুই দিকের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতা তৈরি হয়, তাহলে চলমান অস্থিরতা প্রশমিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
দেশের পোশাকশিল্পের সামনে তাই এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে লাখ লাখ শ্রমিকের ন্যায্য জীবনযাপনের নিশ্চয়তা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের অবস্থান ধরে রাখা। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে ব্যর্থ হলে ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত শ্রমিক, উদ্যোক্তা ও দেশের অর্থনীতি—সব পক্ষকেই বহন করতে হবে। তাই সংঘাত নয়, দ্রুত সংলাপ ও বাস্তবসম্মত সমাধানের পথেই বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ সবচেয়ে বেশি।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত