প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার একটি কলেজে টানা তিন বছর ধরে এইচএসসি পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি। উপজেলার ছয়সূতী ইউনিয়নের নোয়াগাঁও এলাকায় অবস্থিত আবুল কাসেম স্কুল অ্যান্ড কলেজে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে সাতজন শিক্ষার্থী অংশ নিলেও তাদের কেউই পাস করতে পারেনি। এর আগে ২০২৫ ও ২০২৪ সালেও প্রতিষ্ঠানটি থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
শনিবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর কলেজটির ফলাফলের এ চিত্র সামনে আসে। টানা তিন বছর ধরে একই ধরনের ফলাফল হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার মান, পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং সামগ্রিক একাডেমিক পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি স্থানীয়ভাবে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী, ২০২৬ সালে আবুল কাসেম স্কুল অ্যান্ড কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে সাতজন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, তাদের মধ্যে একজনও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এর আগে ২০২৫ সালে ছয়জন এবং ২০২৪ সালে মাত্র দুজন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। ওই দুই বছরেও কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। অর্থাৎ তিন বছরে মোট ১৫ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েও কেউ সফলতার সঙ্গে এইচএসসি পাস করতে পারেনি।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য এমন ধারাবাহিক ফলাফল নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই পর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত ফল না এলে অনেক শিক্ষার্থীর পরবর্তী শিক্ষাজীবন পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনা শুধু একটি ফলাফলের পরিসংখ্যান নয়, বরং এর সঙ্গে শিক্ষার্থী ও পরিবারের প্রত্যাশা, সময়, অর্থ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ও জড়িয়ে থাকে।
২০২৬ সালের পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক বছর ধরে একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীসংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও প্রত্যেক শিক্ষার্থী ও তাঁর পরিবারের কাছে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পর্যায়ে নিয়ে আসতে দীর্ঘ সময় ধরে পরিবার, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে পরিশ্রম করতে হয়। সেই প্রচেষ্টার পর যখন কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না, তখন এর কারণ খুঁজে দেখা জরুরি হয়ে ওঠে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক বিউটি বেগম জানিয়েছেন, আবুল কাসেম স্কুল অ্যান্ড কলেজের স্কুল ও কলেজ শাখার পৃথক কোড নম্বর এবং পৃথক ইআইআইএন রয়েছে। তিনি স্কুল শাখার প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কলেজ শাখার ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে প্রতিষ্ঠাতা আবুল কাসেম স্যার বিস্তারিত বলতে পারবেন বলে জানান তিনি।
কলেজ শাখার অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তখন মোটরসাইকেলে থাকার কথা জানিয়ে ফলাফলের বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। ফলে টানা তিন বছর কোনো শিক্ষার্থী পাস না করার কারণ সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
তবে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গেলে শুধু পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কিংবা পাস-ফেলের পরিসংখ্যান দেখলেই পুরো চিত্র বোঝা যায় না। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, শিক্ষকসংখ্যা, পাঠদানের পরিবেশ, বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি, পরীক্ষার আগে একাডেমিক সহায়তা, অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন এবং শিক্ষার্থীদের পারিবারিক ও আর্থিক পরিস্থিতিসহ নানা বিষয় ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে একটি প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে খারাপ ফলাফলের পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিক ফলাফল সামনে আসায় বিষয়টি এখন প্রশাসনিক নজরের মধ্যে এসেছে। কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) জেসমিন আক্তার জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্তের কথা বলা হওয়ায় এখন নজর থাকবে প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক কার্যক্রম ও ফলাফলের পেছনে প্রকৃত কারণ কী, তার ওপর। তদন্তে যদি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি, ব্যবস্থাপনার সমস্যা বা পাঠদানের দুর্বলতা পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য তা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কোথায় সমস্যা হচ্ছে, সেটিও চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে একটি প্রতিষ্ঠানের ফলাফল শুধু শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর একক ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একটি শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগে কয়েক বছর ধরে যে শিক্ষা কাঠামোর মধ্য দিয়ে যায়, তার প্রতিটি পর্যায়ের ভূমিকা রয়েছে। তাই কোনো প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার্থীরা পাস করতে না পারলে সেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কারণ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
এ ধরনের ফলাফল স্থানীয় শিক্ষার্থীদের মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে আস্থার প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। একটি কলেজে ভর্তি হওয়ার আগে অভিভাবকেরা সাধারণত শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষক, ফলাফল এবং ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিয়ে চিন্তা করেন। টানা কয়েক বছর কোনো শিক্ষার্থী পাস না করলে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি এবং প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অন্যদিকে কলেজটির শিক্ষার্থীদের জন্যও এখন সবচেয়ে প্রয়োজন সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা। যারা ইতোমধ্যে পড়াশোনা করছে, তাদের যেন এই ফলাফলের কারণে নিরুৎসাহিত হতে না হয়, সে বিষয়েও নজর দেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে বিষয়ভিত্তিক সহায়তা, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং পরীক্ষামুখী প্রস্তুতির সুযোগ বাড়ানো গেলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে পারে।
আবুল কাসেম স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাম্প্রতিক ফলাফল তাই কেবল একটি কলেজের পাস-ফেলের হিসাব নয়; এটি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক একাডেমিক কার্যক্রম পর্যালোচনারও সুযোগ তৈরি করেছে। তিন বছর ধরে কোনো শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ার বিষয়টি প্রশাসনের পক্ষ থেকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হলে সমস্যার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে।
এখন তদন্তের মাধ্যমে কী তথ্য সামনে আসে এবং প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার পরিবেশ ও ফলাফল উন্নয়নে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যেন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে অনিশ্চয়তার মুখে না পড়ে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
একটি কলেজের সাফল্য শুধু পরীক্ষায় পাসের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের ভিত্তি তৈরি করাও একটি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাই টানা তিন বছরের শূন্য পাসের এই ফলাফল সংশ্লিষ্টদের জন্য যেমন উদ্বেগের, তেমনি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় জায়গাগুলো পুনর্মূল্যায়ন ও উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও তৈরি করেছে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত