বিএনপি-আওয়ামী লীগের প্রস্তাবেও রাজি হইনি: চরমোনাই পীর

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
বিএনপি-আওয়ামী লীগের প্রস্তাবেও রাজি হইনি: চরমোনাই পীর

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলই বিভিন্ন সময়ে সংসদীয় আসন ও মন্ত্রিত্বের প্রস্তাব দিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে নিজেদের রাজনৈতিক জোটে যুক্ত করতে চেয়েছিল বলে দাবি করেছেন দলটির আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম। তিনি ‘পীরসাহেব চরমোনাই’ নামে পরিচিত। তার ভাষ্য, রাজনৈতিক পদ-পদবি বা ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাজনীতি করে না। দেশ, ইসলাম ও মানুষের কল্যাণকে সামনে রেখেই দলটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।

রোববার বিকেলে বরিশাল নগরীর টাউন হল চত্বরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বরিশাল মহানগর শাখার উদ্যোগে আয়োজিত দাওয়াতি মাসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে দলটির স্থানীয় নেতাকর্মী ও বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলরা উপস্থিত ছিলেন।

বক্তব্যে মুফতি রেজাউল করীম দাবি করেন, সংসদে কয়েকটি আসন পাওয়া কিংবা মন্ত্রিত্বের সুযোগ নেওয়ার জন্য অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমঝোতা করার প্রয়োজন তারা মনে করেননি। তিনি বলেন, যদি তাদের লক্ষ্য কেবল সংসদ সদস্য হওয়া বা মন্ত্রী হওয়া হতো, তাহলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দেওয়া প্রস্তাব গ্রহণ করাই সহজ পথ ছিল। কিন্তু ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সেই পথে হাঁটেনি।

তিনি বলেন, ২০ থেকে ৩০টি সংসদীয় আসন কিংবা এক-দুটি মন্ত্রিত্বের প্রয়োজন হলে এবং তাদের মধ্যে রাজনৈতিক লোভ কাজ করলে অন্য কোনো দলের সঙ্গে জোটে যাওয়ার সুযোগ ছিল। বিএনপি তাদের এমন প্রস্তাব দিয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। একইভাবে আওয়ামী লীগও তাদের এমন প্রস্তাব দিয়েছিল বলে বক্তব্যে উল্লেখ করেন তিনি। তবে এসব প্রস্তাবে তারা আগ্রহী হননি বলে জানান ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ক্ষমতার লোভে রাজনীতি করে না। দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্য দেশকে রক্ষা করা, ইসলামের আদর্শকে সামনে রাখা এবং মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক সমীকরণে সুবিধা নেওয়ার পরিবর্তে নিজেদের আদর্শ ও অবস্থান ধরে রাখাকেই তারা বেশি গুরুত্ব দেন বলেও তিনি দাবি করেন।

একই বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সম্ভাব্য রাজনৈতিক জোট নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন মুফতি রেজাউল করীম। তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, বর্তমানে জামায়াতের সঙ্গে জোট করে নির্বাচনী বা রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আগ্রহী নয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি তাদের মূল লক্ষ্য কেবল সংসদে সদস্য হওয়া হয়, তাহলে অন্য দলের সঙ্গে জোট করে সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রয়োজন কেন হবে।

রাজনীতিতে নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থানের ওপরও জোর দেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির। তিনি বলেন, দলটি নির্ভেজাল সত্যের পথে থেকে দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করতে চায়। ইসলামকে রক্ষা করা এবং মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করাকে তারা রাজনৈতিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে। এ লক্ষ্য থেকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ বা নির্বাচনী ফলাফলের কারণে সরে যাওয়ার সুযোগ নেই বলেও বক্তব্যে তিনি জানান।

জাতীয় নির্বাচন-২০২৬ প্রসঙ্গেও তিনি কথা বলেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এককভাবে ৩০০ সংসদীয় আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই সিদ্ধান্তের পর দলটির প্রতি মানুষের যে সমর্থন প্রকাশ পেয়েছে, তা তাদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ছিল। নির্বাচনে দলটির বাক্সে সাড়ে ২২ লাখের বেশি ভোট পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

মুফতি রেজাউল করীম বলেন, নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফলাফল না এলেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ হতাশ হয়নি। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরাজয় কিংবা বড় ধরনের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়াকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখছে দলটি। নির্বাচনী ফলাফল তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি বলেও জানান তিনি।

তার বক্তব্যে ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের স্বতন্ত্র অবস্থান ধরে রাখার প্রত্যয়ের কথাও উঠে আসে। তিনি দাবি করেন, জাতীয় নির্বাচন-২০২৬-এর পর ইসলামের নামে রাজনীতি করা দলগুলোর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে আলাদা করে দেখার মতো একটি অবস্থান তৈরি হয়েছে। তার মতে, ইসলামী আদর্শের রাজনীতিতে দলটির বিকল্প নেই।

এ সময় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নির্বাচনী ইশতেহারের কথাও তুলে ধরেন দলটির আমির। তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের ইশতেহার প্রকাশ করলেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তাদের ইশতেহারে ইসলাম ও শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিল। দলটি ক্ষমতায় গেলে ইসলাম ও শরিয়াহ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শরিয়াহ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ধরনের ভয় বা ভুল ধারণা রয়েছে, তা নিয়েও বক্তব্য দেন মুফতি রেজাউল করীম। তিনি বলেন, অনেক মানুষের কাছে ইসলাম শব্দটি শুনলেই এক ধরনের ভীতি তৈরি হয়। তাদের কাছে ইসলামকে কঠিন বা ভয়ংকর কোনো বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ ইসলামের প্রকৃত অর্থ ও আদর্শ মানুষের কল্যাণের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে তিনি দাবি করেন।

রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি তিনি ইসলামী আদর্শকে মানুষের কাছে সহজভাবে তুলে ধরার ওপরও গুরুত্ব দেন। তার মতে, ইসলামকে কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝা সম্ভব নয়। মানুষের জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রে ন্যায়, কল্যাণ ও নৈতিকতার প্রতিষ্ঠাই ইসলামের মূল শিক্ষা—এমন ধারণা তুলে ধরেন তিনি।

বরিশালের ওই অনুষ্ঠানে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন। দাওয়াতি মাসের উদ্বোধনী আয়োজনকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যায়। অনুষ্ঠানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থান, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্যও উঠে আসে।

মুফতি রেজাউল করীমের বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন জাতীয় নির্বাচনের পর দেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন দল ও জোটের মধ্যে নতুন সমীকরণ নিয়ে আলোচনা চলছে। সংসদীয় রাজনীতিতে আসন ভাগাভাগি, জোট গঠন এবং ক্ষমতার অংশীদারিত্বের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যেই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নিজেদের আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় ও আদর্শের ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার কথা জানাচ্ছে।

বিএনপি ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অতীতে আসন ও মন্ত্রিত্বের প্রস্তাব পাওয়ার যে দাবি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির করেছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হতে পারে। তবে বক্তব্যে উল্লিখিত প্রস্তাবগুলোর বিস্তারিত সময়, শর্ত বা আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি কোনো নির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্যই বর্তমানে প্রধান ভিত্তি।

তবে তার বক্তব্যের সামগ্রিক বার্তা স্পষ্ট—ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার চেয়ে নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শ ও স্বতন্ত্র অবস্থানকে অগ্রাধিকার দিতে চায়। নির্বাচনী ফলাফল প্রত্যাশামতো না হলেও দলটির রাজনৈতিক লক্ষ্য অপরিবর্তিত রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। ভবিষ্যতে দেশের রাজনীতিতে দলটি কী ধরনের কৌশল গ্রহণ করে এবং জোট রাজনীতিতে তাদের অবস্থান কতটা পরিবর্তিত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com