প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
খেলার মাঠের অভাবে গ্রামের শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ কমে যাচ্ছিল। খোলা জায়গা না থাকায় মাঠের স্বপ্নও যেন ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছিল টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার বাবুপুর গ্রামের মানুষের। কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে বসে থাকেননি গ্রামের বাসিন্দারা। ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ভুলে নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে কয়েক বছর ধরে জমিয়েছেন টাকা। সেই অর্থে কিনেছেন ৫৯ শতাংশ জমি। জমির মালিকের দেওয়া আরও এক শতাংশসহ এখন তাদের হাতে রয়েছে মোট ৬০ শতাংশ জমি।
গ্রামবাসীর এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ এবার নজর কেড়েছে সরকারের। বাবুপুরে একটি মানসম্মত ও পূর্ণাঙ্গ খেলার মাঠ গড়ে তুলতে আরও ১২০ শতাংশ জমি কেনা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে সরকারি সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল ইসলাম এ জন্য সাড়ে চার থেকে পাঁচ কোটি টাকা সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। এর ফলে দীর্ঘদিনের একটি স্থানীয় উদ্যোগ এখন বড় পরিসরে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
রোববার দুপুরে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে গ্রামবাসীর প্রতিনিধি দল এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। বৈঠকে বাবুপুর গ্রামের মানুষের উদ্যোগ, বর্তমানে থাকা জমির পরিমাণ এবং একটি পূর্ণাঙ্গ মাঠ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় জমি ও অবকাঠামোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রতিমন্ত্রী গ্রামবাসীর উদ্যোগের প্রশংসা করে মাঠের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ ও অবকাঠামো নির্মাণে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
বাবুপুর গ্রামের এই গল্প শুরু হয়েছিল কয়েক বছর আগে। গ্রামে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জন্য স্থায়ী কোনো মাঠ ছিল না। গ্রামের বিভিন্ন খোলা জায়গা কিংবা ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করত। কখনো জায়গা নিয়ে আপত্তি, কখনো জমির ব্যবহার নিয়ে নানা সমস্যা—সব মিলিয়ে নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগ ছিল সীমিত। অথচ গ্রামের মানুষের চোখের সামনে বেড়ে উঠছিল নতুন প্রজন্ম, যাদের জন্য একটি নিরাপদ ও স্থায়ী খেলার জায়গার প্রয়োজন ছিল।
সেই প্রয়োজন থেকেই গ্রামের মানুষ নিজেরাই উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সামর্থ্য অনুযায়ী সবাই চাঁদা দিতে শুরু করেন। কারও সামর্থ্য বেশি, কারও কম; কিন্তু মাঠের প্রয়োজনের জায়গায় সেই পার্থক্য বড় হয়ে ওঠেনি। কয়েক বছরের প্রচেষ্টায় জমি কেনার মতো অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। এভাবে ৫৯ শতাংশ জমি কেনা হয়। পরে জমির মালিক আরও এক শতাংশ জমি দান করলে মোট জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ৬০ শতাংশ।
গত বৃহস্পতিবার বাদ্য বাজিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সেই জমি বুঝে নেন গ্রামবাসী। তাদের কাছে এটি ছিল শুধু জমি কেনার আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বহুদিনের একটি স্বপ্নের প্রথম বাস্তব অর্জন। একটি স্থায়ী খেলার মাঠ হবে, সেখানে গ্রামের শিশুরা খেলবে, কিশোররা ফুটবল-ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলায় অংশ নেবে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হয় পুরো গ্রামে।
গ্রামবাসীর এই উদ্যোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি নজরে আসে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের। পরে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে গ্রামের প্রতিনিধিদের মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠানো হয়। সেখানে মাঠের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহবুব হাসান, দেলদুয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা যূথী, গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি খোরশেদ আলম, আজহার শিকদার, মাইন শিকদার এবং মোনালিসা উইমেন্স স্পোর্টস একাডেমির পরিচালক মোনালিসা মুন্নি। তারা বাবুপুরে একটি মানসম্মত খেলার মাঠ তৈরির জন্য কী পরিমাণ জমি ও অর্থ প্রয়োজন, সে বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীকে অবহিত করেন।
মোনালিসা উইমেন্স স্পোর্টস একাডেমির পরিচালক মোনালিসা মুন্নি জানান, একটি পূর্ণাঙ্গ খেলার মাঠ গড়ে তুলতে প্রায় ১৮০ শতাংশ জমির প্রয়োজন। বর্তমানে গ্রামবাসীর হাতে রয়েছে ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ মাঠটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে আরও ১২০ শতাংশ জমি প্রয়োজন। এই জমি কেনা এবং মাঠের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তার ঘোষণা গ্রামবাসীর মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করেছে।
সরকারের ঘোষিত সাড়ে চার থেকে পাঁচ কোটি টাকা সহায়তা বাস্তবায়িত হলে শুধু একটি খেলার মাঠ নয়, বাবুপুরে একটি ক্রীড়া অবকাঠামো গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে। মাঠের পাশাপাশি খেলাধুলার পরিবেশ, প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিভা বিকাশের সুযোগও তৈরি হতে পারে। গ্রামের শিশু-কিশোরদের জন্য এটি ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও ক্রীড়া কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
দেলদুয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা যূথী মনে করেন, এই মাঠ গ্রামের শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের মাদক ও নানা সামাজিক ঝুঁকি থেকে দূরে রাখতে ভূমিকা রাখবে। বর্তমান সময়ে মাঠের অভাবে শিশু-কিশোরদের একটি বড় অংশ মোবাইল ফোন, অনলাইন গেম কিংবা অনিয়ন্ত্রিত অবসর কাটানোর দিকে ঝুঁকে পড়ছে। নিরাপদ ও উন্মুক্ত খেলার জায়গা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একটি গ্রামের মানুষ নিজেদের উদ্যোগে জমি কিনে মাঠ তৈরির যে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, তা স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক ঐক্যেরও একটি দৃষ্টান্ত। সাধারণত বড় কোনো অবকাঠামো নির্মাণে সরকারি উদ্যোগ বা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা দেখা যায়। কিন্তু বাবুপুরের মানুষ দেখিয়েছেন, নিজেদের প্রয়োজনকে সামনে রেখে সম্মিলিত উদ্যোগ নিলে সীমিত সামর্থ্য দিয়েও বড় কাজের ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব।
এই উদ্যোগে গ্রামের প্রবীণদের পাশাপাশি তরুণদেরও ভূমিকা রয়েছে। কারণ মাঠটি মূলত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করা, স্থানীয় প্রতিভা খুঁজে বের করা এবং একটি স্বাস্থ্যকর সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যেই মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে জমি কেনার এই উদ্যোগকে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন হিসেবে দেখলে এর সামাজিক গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলার গুরুত্ব অপরিসীম। মাঠ শুধু খেলাধুলার জায়গা নয়; এটি সামাজিক যোগাযোগ, দলগত কাজ, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা গড়ে তোলারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। গ্রামীণ এলাকায় একটি ভালো মাঠ থাকলে স্থানীয় পর্যায় থেকে ভবিষ্যতের খেলোয়াড় তৈরি হওয়ার সুযোগও বাড়ে।
তবে সরকারি সহায়তার ঘোষণা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অতিরিক্ত ১২০ শতাংশ জমি সংগ্রহ, জমির মালিকানা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং মাঠের অবকাঠামো নির্মাণ—সব ধাপ স্বচ্ছতার সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে মাঠটি যেন ভবিষ্যতে দখল বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহৃত না হয়, সে বিষয়েও কার্যকর ব্যবস্থাপনা দরকার।
বাবুপুরের মানুষ যে উদ্যোগ নিয়ে মাঠের জন্য জমি কিনেছেন, সেটি ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে—একটি এলাকার উন্নয়নে শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে স্থানীয় মানুষও পরিবর্তনের সূচনা করতে পারেন। তাদের সেই উদ্যোগের সঙ্গে সরকারি সহায়তা যুক্ত হলে একটি ছোট গ্রামের মাঠের স্বপ্ন বৃহত্তর সামাজিক উন্নয়নের উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
এখন গ্রামবাসীর প্রত্যাশা, ঘোষিত সহায়তা দ্রুত বাস্তবায়িত হবে এবং ৬০ শতাংশ জমির সঙ্গে আরও ১২০ শতাংশ জমি যুক্ত করে প্রায় ১৮০ শতাংশের একটি পূর্ণাঙ্গ খেলার মাঠ গড়ে উঠবে। যেখানে প্রতিদিন বিকেলে ছুটে আসবে গ্রামের শিশু-কিশোররা, মাঠে ফিরবে খেলাধুলার প্রাণচাঞ্চল্য, আর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পাবে সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার একটি নিরাপদ জায়গা।
চাঁদা তুলে নিজেদের স্বপ্নের মাঠের জন্য জমি কেনা বাবুপুর গ্রামের মানুষের সেই গল্প তাই এখন আর শুধু একটি গ্রামের গল্প নয়। এটি স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ, শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যৎ এবং একটি সুন্দর সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশার গল্প। সরকারি সহায়তার মাধ্যমে সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেলে বাবুপুরের মাঠ হয়ে উঠতে পারে পুরো এলাকার মানুষের জন্য একটি নতুন আশার প্রতীক।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত