শ্রমিকের মজুরিতে বিজিবি নামানো নিয়ে প্রশ্ন নাহিদের

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
শ্রমিকের মজুরিতে বিজিবি নামানো নিয়ে প্রশ্ন নাহিদের

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলন এবং বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের ঘটনায় সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিতে আন্দোলন দমনে বিজিবি মোতায়েনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেছেন, শ্রমিকের মজুরির প্রশ্নে যে রাষ্ট্র রাজপথে বিজিবি নামায়, সেই রাষ্ট্র আসলে কার পক্ষে দাঁড়াচ্ছে—তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

রোববার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে অবিলম্বে একটি ন্যায্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, আন্দোলনে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হামলার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে পোশাক শ্রমিকদের মধ্যে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। গাজীপুর, মিরপুর, আশুলিয়া ও সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়কে অবস্থান এবং কর্মবিরতির মতো কর্মসূচির খবর পাওয়া গেছে। শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় তাদের বিদ্যমান মজুরি দিয়ে পরিবার চালানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।

নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, পোশাক কারখানার শ্রমিকদের একটি বড় অংশ প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেন। দিনের ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত শ্রম দেওয়ার পরও মাস শেষে তাদের হাতে যে অর্থ থাকে, তা দিয়ে বাসাভাড়া, খাবার, চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষা এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তার মতে, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি কোনো বিলাসী চাওয়া নয়; বরং ন্যূনতম জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি মৌলিক দাবি।

পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি সর্বশেষ ২০২৩ সালে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন এনসিপির আহ্বায়ক। এরপর কয়েক বছরে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা এবং অন্যান্য খরচ বেড়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এই বাস্তবতায় বর্তমান মজুরি দিয়ে একজন শ্রমিক ও তার পরিবারের জীবনযাপন কতটা সম্ভব, সে প্রশ্নও তোলেন নাহিদ ইসলাম।

তার অভিযোগ, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি সামনে আসার পরও সরকারের পক্ষ থেকে সমস্যাটিকে দ্রুত সমাধানের পরিবর্তে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবহার করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস ও অন্যান্য দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। এ ধরনের পরিস্থিতিকে তিনি দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন।

সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও সুবিধা বৃদ্ধির প্রসঙ্গও নিজের বক্তব্যে টেনে আনেন নাহিদ ইসলাম। তার দাবি, একই বাজারে বসবাস করা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব একই হলেও বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে শ্রমিকদের দাবি ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হলেও শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বা উসকানি হিসেবে দেখার প্রবণতা বৈষম্যমূলক বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ নিয়েও কথা বলেন এনসিপির আহ্বায়ক। তার বক্তব্য, কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন বা রাজনৈতিক গোষ্ঠী যদি শ্রমিক আন্দোলনকে ব্যবহার করে সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে থাকে, তাহলে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার অভিযোগকে ভিত্তি করে সব শ্রমিকের ন্যায্য দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা উচিত নয় বলেও তিনি মনে করেন।

নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, শ্রমিক আন্দোলনে কিছু মানুষের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থাকলেও সেটিকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর শ্রমিক জনগোষ্ঠীর দাবি অস্বীকার করা হলে সমস্যার প্রকৃত সমাধান হবে না। তার মতে, আন্দোলনে কেউ আইন ভাঙলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু শ্রমিকদের বৈধ অধিকার ও ন্যায্য মজুরির প্রশ্নটি আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, আন্দোলন চলাকালে পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে সংঘর্ষ বা হামলার ঘটনায় শ্রমিকদের পাশাপাশি সংবাদকর্মী ও সাধারণ পথচারীরাও আহত হয়েছেন। তার দাবি, এ ধরনের পরিস্থিতি শ্রমিক অসন্তোষকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনারও দাবি জানান তিনি।

শ্রমিক নেতাদের গ্রেপ্তার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলন নিয়ে মতামত প্রকাশের কারণে সাধারণ শ্রমিকদের আটকের অভিযোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন নাহিদ ইসলাম। তার মতে, শ্রমিকদের অধিকার ও কর্মপরিবেশ নিয়ে কথা বলাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হলে তা নাগরিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।

চলমান সংকট মোকাবিলায় সরকার যে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে, সেটিও সমালোচনা করেছেন তিনি। নাহিদ ইসলামের দাবি, শ্রমিকদের চাপের মুখে বোর্ড গঠন করা হলেও সেখানে একটি কার্যকর ও সময়সীমাবদ্ধ সমাধানের নিশ্চয়তা নেই। ২০২৩ সালের মজুরি নির্ধারণ প্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, দীর্ঘসূত্রতার মাধ্যমে শ্রমিকদের দাবি আবারও পিছিয়ে যেতে পারে।

মজুরি বোর্ডের প্রতিনিধিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এনসিপির আহ্বায়ক। তার দাবি, বোর্ডে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ত শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব থাকলে সেটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তবে বোর্ডের গঠন, প্রতিনিধিদের ভূমিকা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়নের আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।

পোশাক শিল্পের মালিকদের অবস্থান নিয়েও বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, উৎপাদন ব্যয় ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো ব্যবসার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে—এমন যুক্তি থাকলেও এর পুরো ভার শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সমাধান নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে পোশাকের ন্যায্য মূল্য আদায় এবং শিল্প মালিকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের বলেও তিনি দাবি করেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাক খাতের শ্রমিকদের অবদানের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও রপ্তানি আয়ের সঙ্গে লাখ লাখ পোশাক শ্রমিকের শ্রম সরাসরি যুক্ত। তারা দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম করে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাতকে সচল রাখলেও নিজেদের জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা ও স্বচ্ছলতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন—এমন অভিযোগ করেন তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা শুধু শ্রমিকদের স্বার্থের বিষয় নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, শিল্পের স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গেও সম্পর্কিত। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত না হলে দীর্ঘমেয়াদে শিল্প খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

তিনি অবিলম্বে শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসে ন্যায্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আন্দোলনে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিষয়ে পুনর্বিবেচনা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হামলার অভিযোগ তদন্ত, শ্রমিক ছাঁটাই বা কালো তালিকাভুক্তির অভিযোগ বন্ধ এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হওয়ায় এ খাতের শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়তে পারে। অন্যদিকে শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষকে উপেক্ষা করলেও পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সরকার, শ্রমিক ও মালিক—তিন পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে সেই আলোচনার প্রয়োজনীয়তাই সামনে এসেছে। তার প্রশ্ন মূলত শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার, রাষ্ট্রের ভূমিকা এবং অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা নিয়ে। চলমান আন্দোলনের মধ্যে সরকার কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয় এবং মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের প্রত্যাশা কতটা বিবেচনায় নেয়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com