প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার নীলকান্ত সরকারি ডিগ্রি কলেজে এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। কলেজটি থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৪৭ জনই অকৃতকার্য হয়েছেন। ফলে প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এমন ফলাফলকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ের ব্যক্তিরা। এরই মধ্যে ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ হিসেবে কলেজের অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের হাতে ফুলের তোড়া তুলে দিয়েছেন উপজেলা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
সোমবার সকালে কলেজের অফিস কক্ষে গিয়ে অধ্যক্ষ নাজমা বেগমসহ অন্য শিক্ষকদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান মনোহরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের নেতারা। সাধারণত কোনো অর্জন বা সাফল্যে শিক্ষককে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর প্রচলন থাকলেও এবার সেই ফুলই ব্যবহার করা হয়েছে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে। ফল বিপর্যয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি ও শিক্ষার মানোন্নয়নের দাবি তুলে এই অভিনব কর্মসূচি পালন করা হয় বলে জানিয়েছেন ছাত্রদলের নেতারা।
কলেজের ফলাফলের তথ্য অনুযায়ী, এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে মোট ৩০০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। তাদের মধ্যে মাত্র ৫৩ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। বিপরীতে ২৪৭ জন শিক্ষার্থী ফেল করেছেন। এতে পাসের হার ১৭ দশমিক ৬৭ শতাংশে নেমে এসেছে। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার মান, পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে। একটি কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হলে তার পেছনে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত প্রস্তুতির ঘাটতি দায়ী কি না, নাকি প্রতিষ্ঠানটির পাঠদান ও একাডেমিক ব্যবস্থাপনারও কোনো দুর্বলতা রয়েছে—এমন প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিশেষ করে ৩০০ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৪৭ জনের অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি ফলাফলের সামগ্রিক চিত্রকে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে।
এই ফলাফলের প্রতিবাদে উপজেলা ছাত্রদলের পক্ষ থেকে ফুলেল কর্মসূচি পালন করা হয়। সংগঠনটির নেতারা জানান, তারা শিক্ষক ও অধ্যক্ষকে অসম্মান করতে নয়, বরং ব্যতিক্রমী প্রতিবাদের মাধ্যমে ফলাফলের বিষয়টি সবার সামনে তুলে ধরতেই এই কর্মসূচি নিয়েছেন। তাদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
মনোহরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নূর মোহাম্মদ মেহেদী বলেন, এমন ফলাফলের দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারে না। তিনি জানান, ফলাফলের প্রতিবাদেই উপজেলা ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ফুলই তাদের প্রতিবাদের ভাষা। একই সঙ্গে শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা যাতে ভালো ফলাফল করতে পারে, সে ক্ষেত্রে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকবে বলেও জানান তিনি।
ছাত্রদলের এই কর্মসূচিকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে ভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়াও তৈরি হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল নিয়ে রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিবাদ কতটা কার্যকর এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে এ ধরনের কর্মসূচির বাস্তব ভূমিকা কী হতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে ছাত্রদলের নেতারা বলছেন, তাদের উদ্দেশ্য কোনো শিক্ষককে ব্যক্তিগতভাবে হেয় করা নয়। বরং অস্বাভাবিক ফলাফলের বিষয়টি সামনে এনে কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করাই তাদের লক্ষ্য।
একটি কলেজের ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, নিয়মিত ক্লাস, অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন, পরীক্ষার আগে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম এবং প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, পারিবারিক ও আর্থিক পরিস্থিতি এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিতে তাদের নিজস্ব ভূমিকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শুধু ফলাফলের সংখ্যার ভিত্তিতে একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সমীচীন নয়।
তবে ৩০০ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৪৭ জনের অকৃতকার্য হওয়ার হার নিঃসন্দেহে প্রতিষ্ঠানটির জন্য উদ্বেগের বিষয়। এ ধরনের ফলাফল ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসেও প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের মধ্যেও সন্তানের শিক্ষাজীবন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। তাই ফলাফল প্রকাশের পর শুধু দায় নির্ধারণের পরিবর্তে কোথায় সমস্যা হয়েছে, তা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে নীলকান্ত সরকারি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ নাজমা বেগমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ, কলেজ কর্তৃপক্ষের নিজস্ব মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানা সম্ভব হয়নি।
শিক্ষাবিদদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানে হঠাৎ বা ধারাবাহিকভাবে খারাপ ফলাফল হলে সেটিকে কেবল পরীক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করা কঠিন। ফলাফলের বিষয়টি একাডেমিকভাবে পর্যালোচনা করে কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা বেশি পিছিয়ে পড়েছে, কোন শ্রেণিতে শেখার ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত একাডেমিক যোগাযোগ কতটা হয়েছে—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদেরও হতাশ না করে তাদের পরবর্তী সুযোগের জন্য প্রস্তুত করা জরুরি। একটি পরীক্ষায় ব্যর্থতা কোনো শিক্ষার্থীর পুরো ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না। প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা, নিয়মিত অনুশীলন এবং মানসম্মত পাঠদানের মাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তী সময়ে ভালো ফল করতে পারে। এ কারণে বর্তমান ফলাফলকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে সমস্যার বাস্তব সমাধানে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
নীলকান্ত সরকারি ডিগ্রি কলেজের এবারের ফলাফল তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার ফলাফল নয়, বরং স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষার মান নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। ২৪৭ শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার পেছনে প্রকৃত কারণ কী, তা নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা গেলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ফলাফল এড়ানোর পথ বের করা সম্ভব হতে পারে।
ছাত্রদলের ফুলেল প্রতিবাদ সেই প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে। ফুলের মাধ্যমে প্রতিবাদ করার এই প্রতীকী কর্মসূচি যতটা আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ফলাফল থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক উন্নতি সম্ভব নয়।
এখন নীলকান্ত সরকারি ডিগ্রি কলেজের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই ফলাফলকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে এবং ভবিষ্যতের শিক্ষার্থীদের জন্য কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে। ফলাফল নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি যদি দুর্বলতা চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তাহলে এবারের ব্যর্থতা ভবিষ্যতের সাফল্যের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। আর সেটিই হবে ২৪৭ শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত