জানুয়ারি থেকেই বাড়তি মজুরির আশা পোশাক শ্রমিকদের

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
জানুয়ারি থেকেই বাড়তি মজুরির আশা পোশাক শ্রমিকদের
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের উদ্যোগের মধ্যে আগামী জানুয়ারি থেকেই তৈরি পোশাকশ্রমিকেরা বাড়তি মজুরি হাতে পেতে পারেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন নিম্নতম মজুরি বোর্ডের শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাবুল আখতার। তিনি বলেছেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি বিবেচনায় নিয়ে বোর্ড এমনভাবে কাজ করবে, যাতে নতুন মজুরি কার্যকর করতে অযথা বিলম্ব না হয়। একই সঙ্গে চলমান মজুরি আন্দোলনের কারণে আটক বা গ্রেপ্তার হওয়া শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের মুক্তি এবং তাঁদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন তিনি। শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বাবুল আখতার বলেছেন, মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের মতামত ও বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়কে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

সোমবার (২ নভেম্বর) রাজধানীর শ্রম ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিকপক্ষের স্থায়ী প্রতিনিধি আনোয়ার হোসাইনসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন নাজমা আক্তার, আবুল হোসাইন, লাভলী ইয়াসমিন ও সুলতানা বেগম। সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিকদের চলমান অসন্তোষ, নতুন মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম এবং দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য মজুরি কাঠামো নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়।

বাবুল আখতার বলেন, শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবি দীর্ঘদিনের। বর্তমান বাজারদর, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য এবং পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত মজুরি নির্ধারণ করা জরুরি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বোর্ডে শ্রমিকদের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করবেন। তাঁদের লক্ষ্য থাকবে এমন একটি মজুরি কাঠামো তৈরি করা, যাতে শ্রমিকেরা দ্রুত বাড়তি মজুরির সুবিধা পান। তিনি বলেন, আগামী জানুয়ারি থেকে শ্রমিকদের হাতে নতুন মজুরি পৌঁছানোর লক্ষ্য সামনে রেখেই কাজ করা হবে এবং এ ক্ষেত্রে বিলম্বের কোনো কারণ থাকা উচিত নয়।

তবে নতুন মজুরির পরিমাণ কত হবে, কোন গ্রেডে কত টাকা বাড়বে কিংবা কার্যকরের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া কী হবে—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। মজুরি বোর্ডের আলোচনা, শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রস্তাব এবং সরকারের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই বিষয়গুলো নির্ধারিত হবে। ফলে জানুয়ারি থেকে বাড়তি মজুরি পাওয়ার বিষয়ে শ্রমিক প্রতিনিধির আশাবাদ থাকলেও তা এখনো চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত নয়। শ্রমিকদের প্রত্যাশা পূরণে বোর্ডের আলোচনা কত দ্রুত এগোয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

সংবাদ সম্মেলনে চলমান মজুরি আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের আটক বা গ্রেপ্তারের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বাবুল আখতার বলেন, মজুরি-সংক্রান্ত ন্যায্য দাবি উত্থাপন কিংবা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে যেসব শ্রমিক ও শ্রমিক নেতা আটক হয়েছেন, তাঁদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া উচিত। তাঁদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা ও ব্যবস্থা প্রত্যাহারের জন্যও সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, শ্রমিকদের দাবি নিয়ে আলোচনা ও সমাধানের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। কোনো শ্রমিক যেন ন্যায্য দাবি জানানোর কারণে অযথা হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মজুরি বোর্ডে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব থাকলেও তাঁরা এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চান না। সব শ্রমিক ফেডারেশন, কারখানাভিত্তিক ইউনিয়ন এবং সাধারণ শ্রমিকদের মতামত নিয়ে একটি সম্মিলিত অবস্থান তৈরি করতে চান তাঁরা। কারণ মজুরি নির্ধারণের সিদ্ধান্ত সরাসরি লাখো শ্রমিকের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলে। তাই কোনো একটি সংগঠন বা কয়েকজন প্রতিনিধির মতামতের ভিত্তিতে নয়, বরং বিভিন্ন পর্যায়ের শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এ খাতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ করেন, যাঁদের বড় অংশের আয় দিয়ে পরিবারের খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষা এবং অন্যান্য মৌলিক ব্যয় মেটাতে হয়। ফলে মজুরি বৃদ্ধির প্রশ্নটি কেবল কর্মক্ষেত্রের দাবি নয়; এটি শ্রমিক পরিবারের জীবনযাত্রা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। বাজারে চাল, ডাল, তেল, সবজি, বাসাভাড়া ও যাতায়াত ব্যয় বাড়লে সীমিত আয়ের শ্রমিকদের ওপর চাপ আরও বেশি পড়ে। মাসের আয় দিয়ে প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে না পারলে অনেক পরিবারকে খাবার, চিকিৎসা কিংবা সন্তানের শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাটছাঁট করতে হয়।

এই বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে বাবুল আখতার বলেন, গ্রহণযোগ্য মজুরি কাঠামো নির্ধারণের সময় শ্রমিকদের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, পরিবারের মৌলিক চাহিদা এবং শিল্পের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু কারখানার উৎপাদন ব্যয় বা মালিকপক্ষের সক্ষমতা নয়, শ্রমিকের জীবনধারণের প্রয়োজনীয় ব্যয়ও আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত। একই সঙ্গে শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা, উৎপাদন ও রপ্তানি পরিস্থিতি এবং কারখানার আর্থিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে ভারসাম্য রেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারলেই দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হবে।

এর আগে রোববার (১ নভেম্বর) পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ছয় সদস্যের নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে। বোর্ডে সরকার, মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি একজন নিরপেক্ষ সদস্য রাখা হয়েছে। বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম সামছুদ্দিন এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব।

শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন। নিরপেক্ষ প্রতিনিধি হিসেবে বোর্ডে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ। বোর্ডের এই কাঠামোর মাধ্যমে শ্রমিক, মালিক ও নিরপেক্ষ পক্ষের মতামত নিয়ে নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার কথা রয়েছে।

নতুন বোর্ড গঠনের আগে কয়েক দিন ধরে রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়। বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকেরা কারখানার বাইরে জড়ো হন এবং সড়কে অবস্থান নিয়ে দাবি জানান। কোথাও কোথাও যান চলাচল ব্যাহত হয়। শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান মজুরি দিয়ে ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁদের মতে, পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে আয় বাড়ানো জরুরি। অন্যদিকে, পোশাকশিল্পের মালিকদেরও উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতা, ক্রয়াদেশ এবং ব্যবসায়িক সক্ষমতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হয়। এ কারণে নতুন মজুরি নির্ধারণে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার গুরুত্ব অনেক বেশি।

মজুরি বোর্ডের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং একই সঙ্গে শিল্পের সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখে। মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের প্রকৃত আয়, কর্মঘণ্টা, অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক, বাসাভাড়া, খাদ্য ও চিকিৎসা ব্যয়ের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি নতুন মজুরি ঘোষণার পর তা যথাসময়ে কার্যকর হচ্ছে কি না, কারখানাগুলো নিয়ম মেনে শ্রমিকদের বেতন দিচ্ছে কি না এবং কোনো অনিয়ম হলে প্রতিকার কীভাবে পাওয়া যাবে—এসব বিষয়েও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

শ্রমিকদের কাছে জানুয়ারি থেকে বাড়তি মজুরি পাওয়ার প্রত্যাশা তাই কেবল একটি ঘোষণার বিষয় নয়; এটি তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। মাস শেষে বেতন হাতে পাওয়ার পর পরিবারের খরচ মেটাতে গিয়ে যাঁদের প্রতিদিন হিসাব কষতে হয়, তাঁদের জন্য সামান্য আয় বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তি এনে দিতে পারে। তবে সেই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ দিতে হলে মজুরি বোর্ডের দ্রুত ও স্বচ্ছ কার্যক্রম, শ্রমিক-মালিক সংলাপ এবং সরকারের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।

এখন সবার নজর নতুন মজুরি বোর্ডের পরবর্তী কার্যক্রমের দিকে। শ্রমিক প্রতিনিধিরা দ্রুত সিদ্ধান্তের আশ্বাস দিয়েছেন এবং জানুয়ারি থেকে বাড়তি মজুরি কার্যকরের লক্ষ্য তুলে ধরেছেন। কিন্তু চূড়ান্ত মজুরি কত হবে এবং তা বাস্তবায়নের সময়সূচি কী দাঁড়াবে, তা নির্ভর করবে বোর্ডের আলোচনা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমঝোতার ওপর। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণ এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com