ভারতের মণিপুরে নতুন রক্তপাত, পাঁচ কুকি নিহত

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
ভারতের মণিপুরে নতুন রক্তপাত, পাঁচ কুকি নিহত
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে আবারও জাতিগত সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। পৃথক দুটি ঘটনায় কুকি জনগোষ্ঠীর পাঁচজন নিহত হওয়ার পর নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে রাজ্যজুড়ে। নিখোঁজ দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে জাতিগত বিরোধ, নিরাপত্তাহীনতা ও বাস্তুচ্যুতির সংকটে থাকা মণিপুরের বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রশাসনের জন্যও কঠিন হয়ে উঠছে।

পুলিশের বিবৃতি অনুযায়ী, শনিবার নোনে জেলায় অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র ব্যক্তিদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় কুকি সম্প্রদায়ের তিনজন পুরুষ নিহত হন। তবে গোলাগুলির সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল, কারা এতে জড়িত ছিল কিংবা নিহত ব্যক্তিরা কোন পক্ষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—এসব বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ঘটনার পর এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। একই সময়ে রাজ্যের অন্য একটি এলাকায় নিখোঁজ দুই কুকি যুবকের সন্ধানে তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছিল নিরাপত্তা বাহিনী।

রোববার সকালে কাংপোকপি জেলার সঙ্গে সংলগ্ন এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে ওই দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁরা চলতি সপ্তাহের শুরুতে নিখোঁজ হয়েছিলেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের নাম পাওগিনলাল হাংসিং ও টিংগিনলুন চংলোই। তাঁদের বয়স ছিল যথাক্রমে ২০ ও ২১ বছর। ২৮ অক্টোবর তাফৌ কুকি গ্রাম থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁদের সন্ধানে নিরাপত্তা বাহিনীর একাধিক দল অভিযান চালায়। পরে যৌথ তল্লাশি অভিযানে মরদেহ দুটি উদ্ধার করা হয়। তবে তাঁদের মৃত্যুর পেছনে কারা জড়িত, কীভাবে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁরা কোথায় ছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তসাপেক্ষ।

মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কাংপোকপি এলাকায় ক্ষোভ ও উত্তেজনা বাড়তে থাকে। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা বিক্ষোভে অংশ নেন। রোববার রাতেও জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে এবং গাছের গুঁড়ি ও পাথর ফেলে কয়েকটি সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। কিছু এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে। সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহতদের মধ্যে একজন বিক্ষোভকারীর মাথায় আঘাত লাগে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানা গেছে। উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় সোমবার সকালে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের জন্য নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছে কুকি সম্প্রদায়ের একটি শীর্ষ সংগঠন। সংগঠনটির অভিযোগ, এসব হত্যাকাণ্ড তাদের জনগোষ্ঠীর বসতিপূর্ণ এলাকায় উসকানিবিহীন হামলার অংশ। তবে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এবং তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনো স্পষ্ট নয়। পুলিশও এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সংগঠনকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ী করেনি। ফলে অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের মধ্যেই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং কোনো জনগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে দায়ী না করার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মণিপুরে কুকি ও নাগা জনগোষ্ঠীর বিরোধ নতুন নয়। পাহাড়ি এলাকায় বসবাস, ভূমির অধিকার, নিজস্ব পরিচয়, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং পৃথক জাতিগত আবাসভূমির দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে টানাপোড়েন রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কুকি সম্প্রদায়ের কয়েকজন পুরুষের বিরুদ্ধে এক নাগা ব্যক্তিকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর নতুন করে উত্তেজনা বাড়ে। এরপর মে মাসে নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় তিন কুকি যাজক নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার পর দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে থাকে। সাম্প্রতিক পাঁচটি প্রাণহানি সেই বিরোধকে আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

এই সংঘাতের পেছনে শুধু সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা নয়, রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক জটিলতা। মণিপুরের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ভূমির মালিকানা, বসবাসের অধিকার, স্বায়ত্তশাসন এবং নিরাপত্তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি রয়েছে। এসব দাবির সমাধানে রাজনৈতিক উদ্যোগ ও পারস্পরিক আলোচনার অভাব পরিস্থিতিকে বারবার সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হলে সামান্য ঘটনাও বড় সহিংসতার রূপ নিতে পারে। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের পর সেই আশঙ্কাই আরও স্পষ্ট হয়েছে।

মণিপুরের সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে কুকি ও প্রধানত হিন্দু মেইতেই জনগোষ্ঠীর মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে। ২০২৩ সালের মে মাসে অর্থনৈতিক সুবিধা, সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণ এবং ভূমি ও অধিকারসংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক সহিংসতা শুরু হয়। ওই সংঘাতে তিন শতাধিক মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৬০ হাজারের বেশি মানুষ। তাঁদের অনেকেই এখনো নিজ বাড়িতে ফিরতে পারেননি; অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে কিংবা আত্মীয়স্বজনের কাছে বসবাস করছেন। ঘরবাড়ি হারানো, জীবিকা বন্ধ হয়ে যাওয়া, সন্তানদের শিক্ষা ব্যাহত হওয়া এবং স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার মতো সমস্যার মধ্যে দিন কাটছে বহু পরিবারের।

নতুন করে কুকি-নাগা সংঘাত শুরু হওয়ায় আগে থেকেই সংকটে থাকা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এক অঞ্চলে সহিংসতার খবর ছড়িয়ে পড়লে অন্য এলাকায় বসবাসরত একই জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়। নিরাপত্তার কারণে অনেক পরিবার চলাচল সীমিত করে, কেউ কেউ বসতভিটা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার কথা ভাবতে বাধ্য হন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় ব্যবসা, পরিবহন এবং দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও অস্থিরতার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে না। ফলে সংঘাতের ক্ষতি শুধু নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

এদিকে মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলসহ বিভিন্ন এলাকায় কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ভারত সরকারের যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিলের দাবিতে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দাবিকে ঘিরে রাজ্যের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। একদিকে বিভিন্ন সংগঠন নিরাপত্তা ও জবাবদিহির দাবি জানাচ্ছে, অন্যদিকে নতুন হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে।

মণিপুরের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হলো সহিংসতা বন্ধ করা, নিখোঁজ ও নিহত ব্যক্তিদের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা। কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সামগ্রিক অভিযোগ বা প্রতিশোধমূলক হামলা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য রাজনৈতিক সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা এবং ভূমি ও অধিকারসংক্রান্ত বিরোধের গ্রহণযোগ্য সমাধান জরুরি।

পাঁচজনের মৃত্যু মণিপুরের দীর্ঘ সংকটের নতুন এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে উঠেছে। প্রতিটি প্রাণহানির সঙ্গে একটি পরিবার, জীবিকা ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন হারিয়ে যাচ্ছে। বহু বছর ধরে সহিংসতার মধ্যে থাকা রাজ্যটির মানুষের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা। নতুন করে যেন কোনো পরিবারকে প্রিয়জন হারানোর শোক বহন করতে না হয়, সে জন্য দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। মণিপুরে শান্তি ফিরবে কি না, তা নির্ভর করছে শুধু তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নয়; বরং ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিশ্বাস পুনর্গঠনের ওপরও।

 

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com