অভিশংসনের পর গ্রেপ্তার প্যারাগুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার
অভিশংসনের পর গ্রেপ্তার প্যারাগুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়েতে নজিরবিহীন রাজনৈতিক ও আর্থিক সংকটের মধ্যে ক্ষমতা হারিয়েছেন প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনিয়া। দেশটির আলোচিত উয়েনো ব্যাংকের পতন, বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের আমানত আটকে যাওয়া এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত সিনেটে অভিশংসিত হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁকে নিজ বাসভবনে গৃহবন্দি করা হয়। একই ঘটনায় দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

প্যারাগুয়ের এই ঘটনা শুধু একজন রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষমতাচ্যুতির বিষয় নয়; বরং একটি ব্যাংকের আর্থিক বিপর্যয় কীভাবে জাতীয় অর্থনীতি, সাধারণ মানুষের সঞ্চয় এবং রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে, তারও একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে। ব্যাংকটির কার্যক্রমে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপের পর লাখ লাখ গ্রাহক নিজেদের অর্থ ব্যবহার করতে না পারায় দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে সাধারণ আমানতকারীদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, কর্মজীবী মানুষ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকেরাও রয়েছেন।

প্যারাগুয়ের রাজধানী আসুনসিওনসহ বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ও বিক্ষোভ দেখা দেয়। অনেক মানুষ নিজেদের সঞ্চিত অর্থ ফেরত পাওয়ার দাবিতে রাস্তায় নামেন। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকটিতে অর্থ জমা রাখলেও সংকটের মুহূর্তে নিজেদের প্রয়োজনীয় টাকা তুলতে পারছেন না। ফলে দৈনন্দিন কেনাকাটা, চিকিৎসা, সংসারের খরচ এবং অন্যান্য জরুরি প্রয়োজন মেটাতে বিপাকে পড়েছেন অসংখ্য পরিবার।

প্যারাগুয়ের রাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে উয়েনো ব্যাংক। দ্রুত সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশটির অন্যতম বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল ব্যাংকটি। ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা এবং সহজে হিসাব খোলার সুবিধার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক গ্রাহক আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয় প্রতিষ্ঠানটি। বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন, সঞ্চয় এবং পেনশন প্রদানের ক্ষেত্রেও ব্যাংকটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা, ঋণ বিতরণ এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়।

দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক উয়েনো ব্যাংকের আর্থিক অবস্থায় গুরুতর দুর্বলতা শনাক্ত করার পর গত ৩ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করে। ব্যাংকটির ন্যূনতম আর্থিক সক্ষমতা ও মূলধনসংক্রান্ত শর্ত পূরণে ব্যর্থতার বিষয়টি সামনে আসে। এরপর ব্যাংকটির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য বিশেষ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। এর ফলে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক তাঁদের ব্যাংক হিসাবের অর্থ ব্যবহারে বাধার মুখে পড়েন।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, উয়েনো ব্যাংকের গ্রাহকসংখ্যা ছিল প্রায় ২৯ লাখ ৪০ হাজার। প্যারাগুয়ের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৬১ লাখ হওয়ায় ব্যাংকটির এই সংকট দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের জীবনযাত্রায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ফেলে। ব্যাংকটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন লেনদেন আটকে যাওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত আয়, পেনশন কিংবা সংসারের খরচ পরিচালনার জন্য ব্যাংকটির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, তাঁদের দুর্ভোগ ছিল বেশি।

এই আর্থিক বিপর্যয়ের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনিয়ার পূর্ববর্তী ব্যবসায়িক সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আসার পর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়ে। অভিযোগ রয়েছে, পেনিয়া ক্ষমতায় থাকাকালে উয়েনো ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিশেষ সুবিধা প্রদানের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম, ঋণ বিতরণ এবং সরকারি অর্থের বিনিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিরোধী রাজনীতিকেরা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, পেনিয়া অতীতে উয়েনো ব্যাংকের মূল প্রতিষ্ঠান গ্রুপো ভাসকেজের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারধারী ছিলেন। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে তিনি নিজের শেয়ার বিক্রি করে দেন বলে জানা গেছে। তবে তাঁর আগের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা এবং ব্যাংকটির সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। বিরোধী আইনপ্রণেতাদের অভিযোগ, ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় প্রতিষ্ঠানটি সুবিধা পেয়েছে।

এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় ও পেনশন তহবিলের অর্থ ব্যাংকটিতে বিনিয়োগের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় এসেছে। বিভিন্ন বিশ্লেষকের হিসাবে, ব্যাংকটিতে রাষ্ট্রীয় ও পেনশন তহবিল থেকে প্রায় ৮০ কোটি থেকে ৮৬ কোটি ডলার পর্যন্ত অর্থ রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে দেশটির সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অধীন পেনশন তহবিলের বড় অঙ্কের অর্থও রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ব্যাংকটির আর্থিক ঝুঁকি সম্পর্কে যথাযথ নজরদারি না করে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ সেখানে রাখা হয়েছিল। এসব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীরা।

পেনিয়ার বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাত, ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সুবিধা প্রদান এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো বিচারিক প্রক্রিয়ায় চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। পেনিয়ার বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান এবং আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রয়েছে।

রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায় গত ৫ নভেম্বর। ওই দিন পেনিয়া পদত্যাগপত্র জমা দেন বলে জানা যায়। তবে তাঁর পদত্যাগের পরও সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসে অভিশংসনের উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হয়। এর আগে ৩৫ জন আইনপ্রণেতা তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসনের অভিযোগপত্র জমা দিয়েছিলেন। ব্যাংক কেলেঙ্কারি, স্বার্থের সংঘাত এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ ছিল এর অন্যতম ভিত্তি।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দেশটির সিনেটে অভিশংসন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৪৫ সদস্যের সিনেটে ৪৪ জন সদস্য পেনিয়ার বিরুদ্ধে অভিশংসনের পক্ষে ভোট দেন। একজন সদস্য অনুপস্থিত ছিলেন। এর মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর দায়িত্বের অবসান ঘটে। অভিশংসনের সিদ্ধান্তের পরপরই ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা নতুন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে শপথ নেন। তিনি ২০২৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত বর্তমান মেয়াদের বাকি সময় দায়িত্ব পালন করবেন।

পেনিয়ার ক্ষমতাচ্যুতির কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি নির্দেশ কার্যকর করা হয়। নিরাপত্তা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা রাজধানী আসুনসিওনে তাঁর বাসভবনে গিয়ে তাঁকে আটক করেন। পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে নিজ বাড়িতে গৃহবন্দি রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শনিবার (৭ নভেম্বর) স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় অর্থনৈতিক অপরাধ ও দুর্নীতিবিরোধী তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সামনে তাঁর হাজির হওয়ার কথা রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তের অংশ হিসেবে সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকপ্রধান কার্লোস কারভালোকেও আটক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে নতুন প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা দায়িত্ব গ্রহণের পর ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ব্যাংকিং বিপর্যয়ের কারণে যেসব নাগরিক আর্থিক দুর্ভোগে পড়েছেন, তাঁদের ক্ষতিপূরণ ও অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে সরকার দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকেও আমানত সুরক্ষার আওতায় পর্যায়ক্রমে অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী কিছু গ্রাহককে প্রায় ১ হাজার ৬০০ ডলার পর্যন্ত অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী ধাপে অন্য গ্রাহকদের অর্থ ফেরতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো উদ্বেগ কাটেনি। কারণ, ব্যাংকটিতে যাঁদের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় আটকে রয়েছে, তাঁদের অনেকের কাছেই এই অর্থ পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রধান অবলম্বন। অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পেনশন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খরচ এবং ছোট ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন লেনদেনও এই সংকটের কারণে ব্যাহত হয়েছে। ফলে নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আর্থিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

বিশ্লেষকদের মতে, প্যারাগুয়ের এই সংকটের প্রভাব শুধু ব্যাংকিং খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি অর্থের নিরাপত্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্বার্থের সংঘাত প্রতিরোধের বিষয়গুলোও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একটি ব্যাংকের আর্থিক বিপর্যয় যখন লাখ লাখ মানুষের সঞ্চয়কে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়, তখন সেই সংকট মোকাবিলায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে।

সব মিলিয়ে উয়েনো ব্যাংককে ঘিরে আর্থিক কেলেঙ্কারি প্যারাগুয়ের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। প্রেসিডেন্টের অভিশংসন, গৃহবন্দিত্ব এবং নতুন রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তবে সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ ফেরত, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত এই সংকটের পূর্ণ অবসান ঘটবে না। নতুন সরকার এসব চ্যালেঞ্জ কতটা সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারে, তার ওপরই প্যারাগুয়ের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্ভর করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com